বৈষম্যহীন সংস্কৃতি গড়তে সরকারের লক্ষ্য একটি ইনক্লুসিভ সোসাইটি তৈরি করা। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি চর্চা আমাদের সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটাবে না। এ লক্ষ্যেই দেশের প্রতিটি জেলার শিল্পকলা একাডেমিতে তরুণদের মাধ্যমে সংস্কৃতি চর্চা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাৎসরিক ক্যালেন্ডার ও পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় সার্ক ফেস্টিভ্যাল, আন্তর্জাতিক আবৃত্তি উৎসব, আন্তর্জাতিক নৃত্য সম্মেলন, জেলায় জেলায় নাট্যোৎসব, দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং যাত্রাপালা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি জেলার শিল্পকলা একাডেমিতে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে জাতীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টির উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারের মাধ্যমে শিল্প-সংস্কৃতির প্রবাহ তৈরি হবে। এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ শেষে শিল্পকলায় এসে সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও চিত্রকলার চর্চা করবে।

মহাপরিচালক বলেন, ‘পথে পথে সুর ভ্রমণ’ শীর্ষক একটি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের বড় নদীগুলোতে শিল্পকলার উদ্যোগে রেকর্ডিং স্টুডিওসহ জাহাজ তৈরি করা হবে। সেটি যে অঞ্চলের নদীতে নোঙর করবে, সেখানকার স্থানীয়, হারিয়ে যাওয়া ও জনপ্রিয় লোকজ গান সংগ্রহ করা হবে। জাহাজে থাকা স্টুডিওতে বাছাইকৃত গান স্থানীয় শিল্পীদের কণ্ঠে রেকর্ড করা হবে। যাচাই-বাছাই শেষে ইউটিউব ও অন্যান্য মাধ্যমে তা প্রচার করা হবে।

একই সঙ্গে সমতল অঞ্চলের (ডাঙায়) হারিয়ে যাওয়া ও অপ্রচলিত গান ‘পথে পথে গান’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হবে। নতুন শিল্পীদের কণ্ঠে এসব গান পরিবেশন করা হবে। এ দুটি প্রকল্প সারাদেশে সাড়া ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে চলতি বছরে এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল অনুষ্ঠিত হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের চিত্রকর্ম, প্রিন্ট, ভাস্কর্য, আলোকচিত্র, ইনস্টলেশন এবং নতুন মাধ্যমের (নিউ মিডিয়া আর্ট) শিল্পকর্ম এখানে প্রদর্শিত হবে।

আন্তর্জাতিক এ শিল্প প্রদর্শনীর মাধ্যমে এশীয় শিল্পীদের কাজ প্রদর্শনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার মাধ্যমে আধুনিক চিত্রকলার নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পচর্চার প্রসার ঘটবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পীদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে।

মহাপরিচালক বলেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আর্ট বা চিত্রকলা নিয়ে ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে। জেলায় জেলায় বিশ্বমানের দক্ষ ও যোগ্য চিত্রশিল্পী তৈরির লক্ষ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। এসব প্রতিযোগিতায় যারা ভালো করবে, তাদের তালিকা তৈরি করে বিভাগীয় পর্যায়েও প্রতিযোগিতা নেওয়া হবে। পরে জাতীয় পর্যায়ে সেরা ১০ জনকে নির্বাচন করে সম্মাননা দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, কবির সঙ্গে চিত্রশিল্পীর সখ্য-এ ধারণা থেকে ‘ছবি ও কবিতা’ শীর্ষক একটি কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন দেশের চিত্রশিল্পী ও কবিদের সৃজনশীল সম্পর্ক তুলে ধরতে চিত্রশিল্পীর আঁকা ছবিকে ভিত্তি করে কবিতা রচনা করা হবে। এতে শিল্পী ও কবির মধ্যে নতুন এক মেলবন্ধন তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের শিল্পকলার যে স্ট্যান্ডার্ড, সেই পর্যায়ে আমাদের চিত্রশিল্পীদের নিতে হবে। তাদের আন্তর্জাতিক মানের ছবি আঁকা শিখতে হবে। শিল্পীদের চিত্রকলার সৃজনশৈলী, উপস্থাপন ও প্রদর্শনী যেন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হয়, সে লক্ষ্যেই তরুণদের প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, এস এম সুলতান, পটুয়া কামরুল হাসানসহ বরেণ্য শিল্পীদের স্মরণ করা হবে। তাঁদেরকে বুকে নিয়েই আমরা পথ হাঁটবো।

তিনি বলেন, সব মানুষের সংস্কৃতি হলো লোকসংস্কৃতি। লোকসংস্কৃতির কথা বললে প্রথমেই আসে গানের কথা। লালন শাহ, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম, জালাল উদ্দীন খাঁ, বিজন সরকারের মতো কিংবদন্তিদের গান ও সুর যেন হারিয়ে না যায় সেজন্য নতুন প্রজন্মকে দিয়ে পরিবেশনার মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে শিল্পকলা একাডেমি নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

মহাপরিচালক বলেন, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, রফিক আজাদ, আহসান হাবীবসহ অন্যান্য কবিকে সম্মানিত করার পরিকল্পনা রয়েছে শিল্পকলা একাডেমির। জীবিত কিংবদন্তিদেরও সম্মান জানানো হবে।

বার্ষিক পরিকল্পনায় সপ্তাহব্যাপী কয়েকটি আয়োজনও রয়েছে। এর মধ্যে সাত দিনব্যাপী সঙ্গীত উৎসব, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নৃত্য উৎসব ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন উল্লেখযোগ্য।

তিনি বলেন, শিল্পকলায় গবেষণামূলক কাজ তুলনামূলক কম হচ্ছে। কিছু গবেষণাধর্মী কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পটচিত্রের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, রিকশা আর্ট ও যাত্রাপালা নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর নিউ মিডিয়া নিয়েও কাজ চলছে।
মহাপরিচালক বলেন, সম্প্রতি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ উদ্‌যাপন উপলক্ষে পাঁচ দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে ২৮টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতির বর্ণিল উপস্থাপনা, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণের অংশগ্রহণে বৈশাখী শোভাযাত্রা, নৃত্য, সঙ্গীত, আবৃত্তি ও নাট্য পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। ভবিষ্যতেও তাদের নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, দেশে বছরজুড়ে নানান উৎসব হয়। বিশ্বব্যাপী দেশীয় সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাতে এ ধরনের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে পর্যটনবান্ধব করা যেতে পারে। পর্যটকদের অংশগ্রহণে ঐতিহ্যবাহী এ অনুষ্ঠানগুলো আরও প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য হলে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়বে এবং রাষ্ট্র লাভবান হবে।

তিনি আরও বলেন, যে কোনো কাজের জন্য প্রচার-প্রসার প্রয়োজন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম তুলে ধরতে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যমের সম্পৃক্ততায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আরও এগিয়ে যাবে বলে জানান মহাপরিচালক।

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version