নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলা নির্বাচন কমিশন অফিসে চরম অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বে অবহেলা এবং সেবা প্রত্যাশীদের চরম ভোগান্তির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সামান্য কাজের জন্য সেবাগ্রহীতাদের দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে। এরমধ্যেই বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকা এক কর্মীকে বাঁচাতে স্বয়ং নির্বাচন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পুরোনো ছুটির আবেদনে ঘষামাজা করে জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ওই অফিসে গেলে এমন বেহাল চিত্র দেখতে পায়। সেখানে নির্বাচন কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন এবং একজন পিয়ন ছাড়া আর কোনো সহকারী কর্মকর্তা বা কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন না। অথচ অফিসের নিচতলা ও দোতলায় প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন সেবা প্রত্যাশী দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষায় ছিলেন।
এসময় সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগী মো. আবুল কালাম জানান, তিনি সকাল ৯টায় অফিসে এসেছেন এবং বেলা ১১টা পার হলেও তার কোনো কাজ হয়নি। অফিসে দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন না বলেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঢাকা থেকে নিজের তথ্য সংশোধনের জন্য আসা আরেক ভুক্তভোগী শফিকুল ইসলাম ওমর জানান, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করলেও অফিসে কেউ আসেননি।
তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক অবস্থার শিকার হয়েছেন লাউফা গ্রামের কাশেম মিয়া। তিনি বাস্তবে জীবিত থাকা সত্ত্বেও ভোটার তালিকায় তাকে ‘মৃত’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। গুরুতর এই ভুল সংশোধনের জন্য তিনি গত তিন বছর ধরে অফিসে ঘুরলেও এখনো পর্যন্ত কোনো সমাধান পাননি।
জানা যায়, অফিস সহকারীদের মধ্যে কাম-কম্পিউটার অপারেটর আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। তিনি নিয়মিত অফিস করেন না এবং অধিকাংশ সময় দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকেন। তিনি নেত্রকোনা থেকে যাতায়াত করে অফিস করেন। আজ (মঙ্গলবার) সকাল ১১টা ২৮ মিনিটেও আনোয়ার হোসেন অফিসে উপস্থিত ছিলেন না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে অফিস করার কথা থাকলেও তিনি তা মানছেন না।
সকালে আনোয়ার হোসেনের অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে নির্বাচন কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন জানান, আনোয়ার হোসেনের ছেলের এসএসসি পরীক্ষার কারণে তার আসতে দেরি হচ্ছে। অন্যান্য কর্মচারীদের বিষয়ে তিনি দাবি করেন যে তারা ‘রাস্তায় আছেন’।
কিন্তু, একই দিন বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে আনোয়ার হোসেনের বিষয়ে পুনরায় জানতে চাইলে নির্বাচন কর্মকর্তা সুর পাল্টে জানান, আনোয়ার হোসেন ছেলের পরীক্ষার জন্য ছুটি নিয়েছেন। এ সময় ছুটির কাগজ দেখতে চাইলে হাতে লেখা একটি ছুটির আবেদনপত্র দেখানো হয়।
আবেদনপত্রটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, স্পষ্টতই ঘষামাজা করা হয়েছে। গত ৭ই এপ্রিলের একটি পুরোনো আবেদনপত্রের তারিখ কলম দিয়ে কেটে নতুন করে ২১ তারিখ বসানো হয়েছে। ছুটির মূল আবেদনে ‘শারীরিক অসুস্থতা’ লেখা ছিল এবং চলতি মাসের ৮ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দুদিনের ছুটির অংশ কলম দিয়ে কাটা হয়েছে। প্রকৃত আবেদনে যে কলমের কালি ব্যবহার করা হয়েছিল, ঘষামাজাকৃত অংশে সম্পূর্ণ ভিন্ন কালির ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।
এ বিষয়ে দৈনিক কালবেলার উপজেলা প্রতিনিধি আফজাল হোসেন বলেন, “আনোয়ার হোসেন নেত্রকোনা থেকে গিয়ে অফিস করেন এবং মাঝে মধ্যে অফিসে আসেন- এমন তথ্য অনেকদিন ধরেই শুনছিলাম। তাই আজ সকাল ১১টা ২৮ মিনিটে গিয়ে তাকে অফিসে পাইনি। তখন নির্বাচন কর্মকর্তা জানান ছেলের পরীক্ষার জন্য তার আসতে দেরি হচ্ছে। আবার বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে খোঁজ নিলে বলা হয় তিনি ছুটিতে আছেন। ছুটির কাগজে দেখি শারীরিক অসুস্থতার কথা লেখা এবং সেটি গত ৭ তারিখের একটি পুরোনো আবেদনপত্র, যেখানে ঘষামাজা করে ২১ তারিখ বানানো হয়েছে। এটি পুরোপুরি একটি জালিয়াতি।”
সরকারি নথিতে ঘষামাজা ও কাটাছেঁড়া করে ভিন্ন কলমের কালিতে লেখা কেন? এ বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে নির্বাচন কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “আনোয়ার হোসেন আগের দিন বিকেলে ছেলের পরীক্ষার জন্য ছুটির কথা জানিয়েছিলেন এবং তাকে দরখাস্ত লিখে রেখে যেতে বলা হয়েছিল। যেহেতু আনোয়ার হোসেন ওইদিন অফিসে উপস্থিত ছিলেন না, তাই তার কাছ থেকে নতুন করে কোনো দরখাস্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। একারণে আগের পুরোনো দরখাস্ত দিয়েই ছুটি অনুমোদন করা হয়েছে।”
তবে সকালে ‘ছেলের পরীক্ষা’র কথা বলা হলেও দরখাস্তে ‘শারীরিক অসুস্থতা’ লেখা থাকার বৈপরীত্য এবং সরকারি নথিতে ঘষামাজা করে অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নির্বাচন কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

