ফজলে এলাহী মাকাম: জামালপুর জৈব মালচিং এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে পাল্টে গেছে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার এক কৃষকের ভাগ্য। স্বল্প বিনিয়োগে অধিক ফলন ও লাভের অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন উপজেলার গোয়ালেরচর ইউনিয়নের সভারচর গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন। তার অভাবনীয় সাফল্য দেখে এলাকার অন্যান্য কৃষকদের মাঝেও নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে সভারচর গ্রামে গিয়ে কৃষক দেলোয়ার হোসেনের মরিচ খেত পরিদর্শন এবং তার উৎপাদন, চাষ প্রক্রিয়া ও লাভের গল্প শোনা যায়।
কৃষক দেলোয়ার হোসেন জানান, আগে তিনি চিরাচরিত সাধারণ পদ্ধতিতেই মরিচ চাষ করতেন। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ভিশন ও উন্নয়ন সংঘের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন ‘জেসমিন প্রকল্প’ এর আওতায় উৎপাদক দলের সভায় অংশগ্রহণ করেন তিনি। সেখানে জৈব মালচিং পদ্ধতিতে মরিচ চাষ করে অধিক লাভবান হওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন। পরবর্তীতে প্রকল্পের কর্মীদের পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতায় ‘অস্থির-১’ জাতের মরিচের বীজ সংগ্রহ করে জৈব মালচিং পদ্ধতির নিয়ম অনুযায়ী খেত তৈরি করেন। গত অক্টোবর মাসে আবাদ শুরুর পর মাত্র তিন মাসের মধ্যেই গাছে মরিচ আসা শুরু করে।
দেলোয়ার হোসেন জানান, মালচিং পদ্ধতিতে চাষ করা ১০ শতাংশ জমিতে পুরো মৌসুমে মাত্র দুবার সেচ দিতে হয়েছে। খেতে ঘাস কম হওয়ায় শ্রমিক (কামলা) খরচও অনেক বেঁচে গেছে। অন্যদিকে, পাশের ২০ শতাংশ জমিতে সাধারণ পদ্ধতিতে চাষ করা মরিচ খেতের ফলন মাত্র তিন মাসের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়, বাধ্য হয়ে তিনি ওই খেত ভেঙে অন্য ফসলের আবাদ শুরু করেছেন। বর্তমানে মরিচের দাম ভালো থাকায় মালচিং খেত থেকে বন্যা আসার আগ পর্যন্ত আরও অন্তত ৫০ হাজার টাকার মরিচ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও এলাকার কৃষকদের আগ্রহ দেলোয়ারের এমন অভাবনীয় সাফল্য দেখতে প্রতিদিন এলাকার অন্য কৃষকরা তার খেত দেখতে আসছেন। আগামীতে তারাও মালচিং পদ্ধতিতে মরিচ চাষ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং উৎপাদক দলের সদস্য হওয়ার জন্য দেলোয়ারকে অনুরোধ করছেন।
মরিচ চাষ করে সংসারে সচ্ছলতা ফেরার পাশাপাশি সঞ্চয় করতে পারছেন জানিয়ে দেলোয়ার বলেন, “আগামীতে আমি ৩০ শতাংশ জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে মরিচের আবাদ করার পরিকল্পনা করেছি। তবে এর জন্য সহজ শর্তে ঋণ, অধিকতর প্রশিক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ড ভিশন ও উন্নয়ন সংঘের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
বিশেষজ্ঞদের মত ও মাঠ পরিদর্শনওয়ার্ল্ড ভিশনের জেসমিন প্রকল্পের কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. পরিমল সরকার বলেন, “জামালপুরে আমরাই প্রথম কৃষকদের জৈব মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদে উৎসাহিত করেছি। মরিচসহ সাতটি নির্বাচিত ফসল নিয়ে আমাদের কাজ চলছে এবং প্রায় প্রত্যেকটিরই প্রদর্শনী প্লট তৈরি করা হয়েছে। আমাদের এই প্রদর্শনী প্লটগুলোই প্রমাণ করে, সাধারণ পদ্ধতির চেয়ে জৈব মালচিং ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চাষাবাদ করলে কতটা বেশি লাভবান হওয়া যায়।” পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং স্বল্প ব্যয়ে অধিক ফলনের লক্ষ্যে এই পদ্ধতিকে আরও জনপ্রিয় করা হবে বলে তিনি জানান।
প্রদর্শনী প্লট পরিদর্শনের আগে সভুরচর উৎপাদক দলের সাথে সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দলের দায়িত্ব, কার্যক্রম ও সফলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পরে ইসলামপুরে জেসমিন প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ কর্মীদের সাথে পর্যালোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়।
মাঠ পরিদর্শন ও সভায় উপস্থিত ছিলেন, উন্নয়ন সংঘের মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিচালক জাহাঙ্গীর সেলিম, ওয়ার্ল্ড ভিশনের লাইভলিহুড ম্যানেজার মো. মোশফেকুর রহমান, জেসমিন প্রকল্পের ব্যবস্থাপক অসীম চ্যাটার্জি, ভ্যালুচেইন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ কবির, নিউট্রিশন বিশেষজ্ঞ নাহিদা ইসলাম, জেন্ডার বিশেষজ্ঞ শফিকুর রহমান, কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ কওনান মোরছালিন, এমএন্ডই ম্যানেজার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং উন্নয়ন সংঘের জেসমিন প্রকল্পের উপজেলা সমন্বয়কারী বিজন কুমার দেব।
