গাইবান্ধা:
প্রকৃতিতে চৈত্রের বিদায়ের সুর, গাছে গাছে নতুন পাতার উচ্ছ্বাসে জানান দিচ্ছে বৈশাখের আগমনী বার্তা। ঋতুরাজ বসন্ত বিদায় নিচ্ছে, আর সেই সুরেই গাইবান্ধাজুড়ে শুরু হয়েছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বরণের প্রস্তুতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর বাণী— “মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে সূচি হোক ধরা”—এই চেতনায় নতুন বছরকে বরণ করতে প্রস্তুত এ জেলার মানুষ। নববর্ষকে ঘিরে ইতোমধ্যে গাইবান্ধা শহরে শুরু হয়েছে নানা আয়োজনের প্রস্তুতি।
জেলা প্রশাসন, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে আয়োজন করছে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা। শহরের পৌরপার্ক, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বসবে বৈশাখী অনুষ্ঠান । গাইবান্ধা শহরের জিউকে রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, বর্ষবরণের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিষ্ঠানটির চারু ও কারুকলা বিভাগের শিক্ষক আল আমিন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি তৈরি করছেন নানা রঙের মুখোশ, পাখি, গ্রামীণ জীবনের প্রতীকী নকশা ও বৈশাখী শোভাযাত্রার বর্ণিল সব উপকরণ।
চারু ও কারুকলা বিভাগের শিক্ষক আল আমিন বলেন, “পহেলা বৈশাখ আমাদের বাঙালির প্রাণের উৎসব। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে আমরা প্রতি বছরই এমন আয়োজন করি। মুখোশ তৈরির মাধ্যমে তারা আমাদের ঐতিহ্য ও শিকড় সম্পর্কে জানতে পারে।” প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাফ উল ইসলাম জানায়,“আমরা নিজের হাতে মুখোশ বানানোর কাজে স্যারকে সাহায্য করছি , খুব ভালো লাগছে। আগে শুধু শোভাযাত্রা দেখতাম, এবার নিজেরাই অংশ নিতে পারব এটা ভেবেই বেশি আনন্দ লাগছে।” আরেক শিক্ষার্থী শারাবান তহুরা জানান , “বইয়ের বাইরে এই ধরনের কাজ আমাদের অনেক কিছু শেখায়।
আমরা দলবদ্ধভাবে কাজ করছি, এতে বন্ধুত্বও আরও মজবুত হচ্ছে।” বিদ্যালয়টির অধ্যক্ষ জহুরুল কাইয়ুম বলেন,“শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমরা চাই, তারা শুধু পাঠ্যবই নয়, নিজেদের সংস্কৃতিকেও হৃদয়ে ধারণ করুক।” গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন জানিয়েছে পহেলা বৈশাখের সকালে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে গাইবান্ধা শহরের স্বাধীনতা প্রাঙ্গণ থেকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এছাড়া দিনভর থাকবে সংগীত পরিবেশনা, কবিতা আবৃত্তি এবং লোকজ সংস্কৃতির নানা উপস্থাপনা। স্থানীয় শিল্পীরা পরিবেশন করবেন জারি-সারি, ভাওয়াইয়া ও পালাগান, যা গ্রামীণ বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরবে।
বাঙালির চিরায়ত খাবার পান্তা-ইলিশ, মুড়ি-মুড়কি, পিঠাপুলির আয়োজনও থাকবে বিভিন্ন স্থানে। এছাড়া শহরের রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলোও বৈশাখী বিশেষ মেনু সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছে। পাশাপাশি গ্রামীণ জনপদেও নিজস্ব আয়োজনে উদযাপিত হবে বাংলা নববর্ষ। গাইবান্ধা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাবুল আকতার জানান ” ঢাকার চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার আদলে গাইবান্ধাতেও আয়োজন করা হচ্ছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা।
এতে অংশ নেবেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য এবং সর্বস্তরের মানুষ। বৈশাখী শোভাযাত্রায় স্থান পাবে গ্রামীণ জীবনের প্রতীক, মুখোশ, পুতুল ও বিভিন্ন নকশা, যা বাংলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরবে।” জেলা প্রশাসনের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি ) সাব্বির আহমেদ বলেন,“শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারে।”
