নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে ‘বিষমুক্ত খাবার-সুস্থ জীবন’ স্লোগানকে সামনে রেখে নেত্রকোনায় নিরাপদ খাদ্য ও জৈবকৃষি বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বক্তারা কৃষিতে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরেন।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বেলা ১১টায় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বারসিক’ এর সহযোগিতায় নেত্রকোনা সদর উপজেলার কাইলাটি ইউনিয়নের জৈবকৃষি চর্চা দলের সদস্যরা এ সভার আয়োজন করেন। স্থানীয় কৃষক গোলাম মোস্তফা মধু’র জৈব কৃষি ফার্মে সচেতনতামূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় কাইলাটি ইউনিয়নের ২১ জন জৈবকৃষি চর্চাকারী, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণকারী, সবজি চাষি, পারিবারিক কৃষি চর্চাকারী ও জৈবকৃষি উদ্যোক্তা অংশগ্রহণ করেন।
এতে সাবেক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ছাদ কৃষির উদ্যোক্তা মো. মোফাজ্জল হোসেন প্রধান অতিথি এবং বিশেষ উপস্থিতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- সাবেক কৃষি কর্মকর্তা অজিত পাল, কৃষক আব্দুল হাই, তারা মিয়া, খায়রুল ইসলাম, কৃষানি লুৎফা, জাকিয়া বেগম, হালেমা, পরিবেশ কর্মী আব্দুল হামিদ কবিরাজ এবং প্রবীণ কৃষক সিদ্দিকুর রহমান প্রমুখ।
কৃষক মজনু মিয়া সভাপতিত্বে আলোচক ছিলেন ভার্মিকম্পোস্ট গবেষক ও মধুচাষি শিক্ষক গোলাম মোস্তফা মধু এবং কৃষক সুজন মিয়া।
সভায় আলোচকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে বর্তমানে যে হারে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হচ্ছে, তা জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। বর্তমানে সবজি বাগানে প্রতিনিয়তই বিপজ্জনক সব রাসায়নিক প্রয়োগ করা হচ্ছে।
কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো আলোচনা সভায় তুলে হয়। তা হলো- রিপকর্ড, সিমবুশ, হেপ্টাক্লোর, থায়াডিন, কার্বোফুরান এবং ডিডিটি-এর মতো ক্ষতিকর কীটনাশক যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রয়োগের পর এসব কীটনাশকের বিষক্রিয়ার স্থায়িত্বকাল তিনি থেকে ২১ দিন পর্যন্ত থেকে যায়, যা খাদ্যের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের উপকারী প্রাণী, যেমন- ব্যাঙ, সাপ, পতঙ্গভোজী প্রাণী এবং বিভিন্ন সরীসৃপ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। জমির বালাইনাশক বৃষ্টির পানিতে মিশে নদী-নালা, খাল-বিল ও পুকুরে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে মাছের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি মাছের প্রজনন ক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে এবং পরিবেশ তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারাচ্ছে।
প্রধান অতিথি মো. মোফাজ্জল হোসেন তার বক্তব্যে বলেন, “অত্যধিক ও নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহারের কারণেই জনস্বাস্থ্য আজ উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। খাদ্যে রাসায়নিক উপাদানের কারণে অসংখ্য মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এবং দিন দিন অসংক্রামক রোগ ও চিকিৎসাব্যয় বাড়ছে, যা চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে।”
তিনি নিরাপদ খাবার তৈরি, বিপণন ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এবং ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ এর দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান।
সভাপতির বক্তব্যে কৃষক মজনু মিয়া বলেন, “কীটনাশক ও ভেজালের মিশ্রণযুক্ত ফল-সবজি খেয়ে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগে ভুগছে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, গ্যাস্ট্রিক, লিভার নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং ক্যানসারের মতো ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে। ভেজাল ও রাসায়নিকযুক্ত খাবারের কারণে শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”
পরিবেশবান্ধব কৃষিকাজকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আলোচনা সভার শেষে কৃষকদের মাঝে সচেতনতার প্রতীক হিসেবে জৈবকৃষি ফার্মের পক্ষ থেকে পুদিনা, লেটুস ও নিমের চারা উপহার দেওয়া হয়। বিষমুক্ত কৃষির এমন উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
