নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নেত্রকোনায় পালিত হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টায় নেত্রকোনা পৌরসভার সামনের সড়কে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা স্থানীয় পর্যায়ে হামের প্রাদুর্ভাব ও মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। একইসঙ্গে, ‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ’ এর পক্ষ থেকে দেশের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী ও টেকসই করার লক্ষ্যে ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে নেত্রকোনার ‘স্বাস্থ্য অধিকার ফোরাম’ ও ‘স্বাস্থ্য অধিকার যুব ফোরাম’ এবং সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে নেত্রকোনার ‘স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি (সাস)’, ‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ, ঢাকা’ ও সুইডেন সরকার।
মো. আলমগীরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক বাচ্চু। তিনি তার বক্তব্যে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধির জোর দাবি জানান। তিনি বলেন, “দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধারদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বাড়ানো অপরিহার্য।”
বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী নেত্রকোনায় সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “নেত্রকোনায় শিশুদের মাঝে ব্যাপকভাবে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। হামের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের মাঠে নামতে হবে এবং স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিশুদের টিকা দিয়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে আরও জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সমন্বিত সামাজিক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “অপুষ্টির কারণে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। মৌলিক চাহিদার মধ্যে স্বাস্থ্য অন্যতম। হাসপাতালগুলোর পরিবেশ উন্নত করা এবং চিকিৎসকদের কার্যক্রম যথাযথ মনিটরিংয়ের আওতায় আনা প্রয়োজন।”
আবু আব্বাছ ডিগ্রী কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. নাজমুল কবির সরকার বলেন, “দীর্ঘায়ু লাভের চেয়ে সুস্থভাবে বাঁচাটা বেশি জরুরি। সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে সঠিক সমন্বয় থাকতে হবে।”
নেত্রকোনা জেলা শাখার উদীচীর সভাপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান খান শিশুদের টিকার অপ্রতুলতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “টিকার অভাবে অনেক শিশু মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে। সরকারের উচিত দ্রুত এর ব্যবস্থা করা।” এছাড়া তিনি নেত্রকোনা পৌরসভার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে পৌরসভার বর্তমান কার্যক্রম অপ্রতুল। ড্রেন পরিষ্কার ও মশক নিধনে দ্রুত কার্যকর ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।”
মানববন্ধন থেকে শক্তিশালী, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে ‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ’ এর পক্ষে ১০টি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়।
উত্থাপিত দাবিগুলো হলো- অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, প্রাণী থেকে মানুষে ছড়ানো রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ, পরবর্তী মহামারীর জন্য আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ, পশুপালনে ও পশু খাদ্যে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার রোধ, পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় পদক্ষেপ, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়াতে হবে; বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য, মাতৃ স্বাস্থ্য এবং শিশু স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে, অনতিবিলম্বে অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের মূল্য চূড়ান্ত ও প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ, সেবার মানোন্নয়নে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ ও মতামত গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরাসরি মতবিনিময়ের ব্যবস্থা, কর্মস্থলে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাদের বসবাসের উপযোগী আবাসন ও অন্যান্য সুবিধা এবং কর্মস্থলে চিকিৎসকসহ সকল সেবাদানকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।
কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং যুব ফোরামের সদস্যরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। “টুগেদার ফর হেলথ, স্ট্যান্ড উইথ সায়েন্স”- এই স্লোগানকে ধারণ করে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নিয়ে এ কর্মসূচীর সমাপ্তি ঘটে।
