স্বীকৃতি বিশ্বাস, যশোরঃ
বসন্তের আগমনে প্রকৃতি সেজেছে নবরূপে। চারিদিকে আনন্দের ধারা বহিছে আপন মনে। পাখির কলকাকলীতে মুখরিত ভুবনকে আরও আনন্দময় করতে ও মানুষের হৃদয়কে আলোড়িত করতে যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হচ্ছে বাসন্তী পূজা। আজ ২৬ মার্চ ২০২৪ (চৈত্র মাস), বাসন্তী পূজার মহাষ্টমী। শরৎকালের দুর্গাপূজা বেশি জনপ্রিয় হলেও শাস্ত্র মতে বসন্তকালের এই পূজাই হলো আদি দুর্গাপূজা। এই বছর (১৪৩২ বঙ্গাব্দ) বাসন্তী পূজার মহাষ্টমী তিথি ও সন্ধিপূজার সময়টি পড়েছে: তারিখ: ১০ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ (২৬ মার্চ, ২০২৬), বৃহস্পতিবার।
মহাষ্টমী বিহিত পূজা: ২৬ মার্চ (বৃহস্পতিবার) সকালের মধ্যে সম্পন্ন হবে। পুষ্পাঞ্জলি: সাধারণত সকাল ৮টা থেকে ১১টার মধ্যে মণ্ডপে মণ্ডপে পুষ্পাঞ্জলি অনুষ্ঠিত হবে। মহাষ্টমীর দিন সকালে স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্রে দেবীর সংকল্প পূজা করা হয়। অষ্টমাদি কল্পারম্ভ: দেবীর বিশেষ ষোড়শোপচারে পূজা। অষ্টশক্তির পূজা: মহাষ্টমীতে দেবীর আটটি রূপ বা শক্তির পূজা করা হয়— ব্রাহ্মণী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, বারাহী, নারসিংহী, ঐন্দ্রী ও চামুণ্ডা। পুষ্পাঞ্জলি: এটি মহাষ্টমীর প্রধান আকর্ষণ। ভক্তরা উপবাস থেকে ভক্তিভরে দেবীর চরণে ফুল ও বেলপাতা অর্পণ করেন।
সন্ধিপূজা:মহাষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট এবং মহানবমীর শুরুর ২৪ মিনিট—এই মোট ৪৮ মিনিটের মাহেন্দ্রক্ষণকে বলা হয় সন্ধিপূজা। তাৎপর্য: পুরাণ মতে, দেবী দুর্গা যখন মহিষাসুরকে বধ করছিলেন, তখন চণ্ড ও মুণ্ড নামক দুই অসুর পেছন থেকে আক্রমণ করে। দেবী তখন প্রচণ্ড ক্রোধে চামুণ্ডা রূপ ধারণ করেন। ঠিক যে মুহূর্তে দেবী সন্ধি বা মিলনস্থলে অবস্থান করে অসুর নিধন করেছিলেন, সেই মুহূর্তটিই সন্ধিপূজা। রীতি: এই সময়ে দেবীকে ১০৮টি পদ্মফুল অর্পণ করা হয় এবং ১০৮টি মাটির প্রদীপ জ্বালানো হয়। অনেক জায়গায় এই সময়ে চালকুমড়ো বা আখ বলি দেওয়ার প্রথা আছে।
কুমারী পূজাঃ বাসন্তী পূজার মহাষ্টমীতে অনেক মণ্ডপে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ১ থেকে ১৬ বছরের অবিবাহিত কন্যা শিশুকে দেবীর প্রতিচ্ছবি হিসেবে পূজা করা হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের মতে, “শুদ্ধাত্মা কুমারীর মধ্যে দেবী মা বিশেষভাবে আবিষ্ট থাকেন।” সন্ধিপূজার মাহেন্দ্রক্ষণ: দুপুর ২টো ৪৫ মিনিট থেকে দুপুর ৩টে ৩৩ মিনিট পর্যন্ত।
সন্ধিপূজার গুরুত্ব ও রীতিঃএই সময়টিকে দেবী দুর্গার শক্তির সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। ভক্তরা এই সময়:১০৮টি পদ্ম: দেবীকে নিবেদন করেন। দীপাবলি: ১০৮টি মাটির প্রদীপ জ্বালানো হয় যা অন্ধকার ও অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। মৌনতা: অনেক জায়গায় সন্ধিপূজার ক্ষণটিতে আরতি ছাড়া অন্য কোনো উচ্চবাচ্য না করে একমনে দেবীর ধ্যান করা হয়। মহাষ্টমীর মাহাত্ম্য ও পৌরাণিক কাহিনী পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ত্রেতাযুগে রাবণকে বধ করার জন্য শ্রীরামচন্দ্র অকালে (শরৎকালে) দেবীর আরাধনা করেছিলেন, যা ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত।
কিন্তু মূল দেবীভাগবত ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে, রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি এই বসন্তকালেই প্রথম মৃন্ময়ী মূর্তিতে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। রাজা সুরথের কাহিনী: রাজ্য হারিয়ে এবং আপনজনদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে রাজা সুরথ মেধস মুনির আশ্রমে আশ্রয় নেন।
সেখানে তিনি মহর্ষি মেধসের কাছে ‘দেবী মাহাত্ম্য’ শ্রবণ করেন। নিজের হৃত গৌরব ফিরে পেতে তিনি চৈত্র মাসে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। দেবী তুষ্ট হয়ে তাকে বর দান করেন, যা পরে বাসন্তী পূজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মহাষ্টমীর এই পুণ্য তিথিতে দেবীর কাছে প্রার্থনা করি সকলের জীবন সুখ ও শান্তিতে ভরে উঠুক।
