নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড় ও তীব্র শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক তাণ্ডব চলেছে। শনিবার (১৪ মার্চ) রাতের প্রাকৃতিক দুর্যোগে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের কাঁচা-আধাপাকা ঘরবাড়ি, উপড়ে পড়েছে অসংখ্য গাছপালা। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে ও তার ছিঁড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে শিলার আঘাতে উঠতি বোরো ধান ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় ঈদের আগে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ করেই শুরু হয় প্রচণ্ড দমকা হাওয়া ও শিলাবৃষ্টি। প্রায় ২০-২৫ মিনিটের তাণ্ডবে সদর, আগিয়া, হোগলা, ঘাগড়া, বিশকাকুনী, ধলামূলগাঁও এবং নারান্দিয়া ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঝড়ের তীব্রতায় বড় বড় গাছ ভেঙে পড়ে বসতঘর, দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর। ঘাগড়া ফয়জুল উলুম স্কুল অ্যান্ড মাদ্রাসাটি এ সময় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঝড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। উপজেলার ৪নং জারিয়া ইউনিয়নের বারধার (বারহা) এলাকায় রেললাইনের ওপর একটি বিশালাকার গাছ ভেঙে পড়লে জারিয়া লোকাল ট্রেনের চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে রেললাইন থেকে গাছ সরিয়ে নিলে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে সড়কের ওপর গাছ পড়ে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঝড়ে বিদ্যুতায়নের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অন্তত ১০টি বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে গেছে এবং বেশ কয়েকটি হেলে পড়েছে। অনেক জায়গায় ট্রান্সফরমার বিকল হওয়ায় শনিবার রাত থেকেই উপজেলার অধিকাংশ এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কর্মীরা নিরলস কাজ করছেন এবং পর্যায়ক্রমে সংযোগ চালু করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
আকস্মিক এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। বিশকাকুনী, সদর ও ঘাগড়া ইউনিয়নে বোরো ধান, ভুট্টা ও উঠতি সবজির ক্ষেত শিলার আঘাতে একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। সদর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল আজিজ আক্ষেপ করে বলেন, “গত রাতের ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে আমার বোরো ধানের ক্ষেতের অনেক ক্ষতি হয়েছে। যেসব ধানে সবেমাত্র শীষ বের হচ্ছিল, সেগুলো শিলার আঘাতে নষ্ট হয়ে গেছে। এবার আর ফলন পাওয়া কঠিন হবে।”
ঘাগড়া ইউনিয়নের বাইঞ্জা এলাকার কৃষক মো. এমদাদুল ইসলাম বলেন, “লিজ নিয়ে ১১২ শতক জমিতে ভুট্টা ও ১৪৮ শতক জমিতে শসার আবাদ করেছিলাম। ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন কীভাবে ক্ষতি পুষিয়ে নেব বুঝতে পারছি না। সরকারের সহায়তা দরকার।”
এদিকে বসতবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে অনেক পরিবার। সদর ইউনিয়নের তারাকান্দা গ্রামের সোহেল ভূঁইয়া জানান, ঝড়ের সময় বসতঘরের ওপর প্রায় দেড় থেকে দুই শত বাঁশসহ আস্ত একটি বাঁশঝাড় ভেঙে পড়ে। এতে তার দুটি ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। ঈদের আগে এমন মর্মান্তিক ক্ষতিতে তিনি প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জোবায়ের হোসেন জানান, গতকালের শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে পূর্বধলা উপজেলায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০ হেক্টর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরমধ্যে ধান, ভুট্টা, শসাসহ বিভিন্ন শাকসবজি রয়েছে। ফসলের চূড়ান্ত ক্ষতি নিরূপণে মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষি প্রণোদনার মাধ্যমে সরকারি সহায়তা প্রদান করা হবে।
অন্যদিকে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আছাদুজ্জামান জানিয়েছেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘরবাড়ি ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যেসব মানুষের বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা যোগাযোগ করলে সরকারি বিধি মোতাবেক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।


