ফজলে এলাহী মাকাম: জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার ভরাট হয়ে যাওয়া ১৪টি খাল খনন ও সংস্কার করা হলে এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূর হওয়ার পাশাপাশি সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে, যা পাল্টে দেবে নদী তীরবর্তী হাজারো মানুষের জীবনযাত্রার মান।
যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় অবস্থিত ইসলামপুর উপজেলার মাটি প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত উর্বর। এখানকার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। নদী তীরবর্তী এলাকার কৃষকরা ধান, পাট, আখ, সরিষা, তামাক, চীনাবাদাম, শাকসবজি, মসুরী ও ভুট্টাসহ নানা ফসলের চাষাবাদ করেন। কৃষির পাশাপাশি মৎস্য শিকার এবং তাঁত, কামার, কুমার ও নকশি কাঁথা তৈরির মতো ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ওপরও এলাকার অর্থনীতি নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার বেশিরভাগ খাল দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা চরম সেচ সংকটে ভুগছেন এবং বর্ষায় জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ খাল রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- গাইবান্ধা ইউনিয়নের ফুলকার চর ছাইতনতলা থেকে উত্তর চর গোয়ালিনী ইউনিয়নের কান্দারচর দশানী নদী পর্যন্ত সাত কিলোমিটার ‘জিয়া খাল’, পাথর্শী ইউনিয়নের দেলীরপাড় থেকে যমুনা নদীপাড় পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার ‘জিয়া খাল’, লাওদত্ত ব্রিজ থেকে পাথরঘাটা পর্যন্ত তিন কিলোমিটার ‘পুটি খাল’ এবং পাথরঘাটা থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র খাল’।
এছাড়াও রয়েছে চিনাডুলী ইউনিয়নের বলিয়াদহ খাল, ঢেংগারগড় খাল, পচাবহলা খাল; পলবান্ধা ইউনিয়নের বাটিকামারী খাল, কাঠমা কৃষ্ণনগর খাল, মাইজবাড়ী খাল, চর টগা খাল, চর নন্দনেরপাড় খাল, চর পুটিমারী খাল এবং গোয়ালের চর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র খাল। দীর্ঘদিন ধরে খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালগুলো দখল হয়ে বর্তমানে মরা খালে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, এই ১৪টি খাল খনন করা হলে এলাকার কৃষি ও জীববৈচিত্র্যে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। খালের পানির প্রবাহ স্বাভাবিক হলে অবিরাম জলাবদ্ধতার অবসান ঘটবে এবং দেশীয় মাছের উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। এতে স্থানীয়দের আমিষের চাহিদা মেটার পাশাপাশি নতুন আয়ের উৎস তৈরি হবে। এছাড়া কৃষকরা স্বল্প খরচে সেচ সুবিধা পাবেন, ফলে হাজার হাজার বিঘা পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আসবে এবং বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতেও এটি বড় ভূমিকা রাখবে।
পতিত ব্রহ্মপুত্র খালের পাড়ের কৃষক আলম শেখ (৬০) আক্ষেপ করে বলেন, “একসময় আমরা খালের পানি দিয়ে সহজেই আবাদ করতাম। এখন খাল শুকনো থাকায় সেচ পাম্প দিয়ে বছরে একটি ফসল ফলাতেই অনেক খরচ হয়ে যায়। মরা খালটি খনন হলে পর্যাপ্ত পানি থাকবে, তখন রবি শস্যসহ বছরে দুটি ফসল অনায়াসেই ঘরে তুলতে পারব।”
গাইবান্ধা ইউনিয়নের কৃষক কবির হোসেন (৫৫) জানান, চরাঞ্চলের ২০টি গ্রামের মানুষ কৃষি ও মাছের জন্য জিয়া খালের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। চর পুটিমারী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য জবেদ আলীও একমত পোষণ করে জানান, জিয়া খালটি খনন করা হলে অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।
এ বিষয়ে ইসলামপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেজুয়ানল ইফতেকার বলেন, “খালগুলো খনন করলে এলাকার জীববৈচিত্র্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। আমরা ইতোমধ্যে খালগুলোর সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছি।”
অন্যদিকে, ইসলামপুর আসনের সংসদ সদস্য সুলতান এ. ই. মাহমুদ বাবু আশার বাণী শুনিয়ে বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের একটি বৃহৎ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এর আওতায় ইসলামপুর আসনের খালগুলো পুনঃখনন করার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই খনন কাজ শুরু হবে।”
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ইসলামপুর উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
