নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ৫০ লাখ টাকা ঋণ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিন লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, মামলার বাদীর নিজের দেওয়া সাক্ষীরাই এ ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন। একইসাথে ব্যাংক কর্মকর্তাদের দাবি, নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে গ্রাহক মিথ্যা ও সাজানো মামলাটি দায়ের করেছেন।
এ মামলার বাদী আলপনা মৎস্য ও গরু মোটাতাজাকরণ মিশ্র খামারের উদ্যোক্তা বারহাট্টার ডেমুরা গ্রামের মৃত আ. রশিদের ছেলে কামাল তালুকদার (৬০)।
আদালতে দায়ের করা অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, কৃষি ব্যাংক বারহাট্টা শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিনকে ১নং এবং একই শাখার মূখ্য কর্মকর্তা আল বারী উল মোসাব্বেরকে ২নং আসামি করা হয়েছে।
মামলায় বাদীর অভিযোগ, তার খামারের ঋণ বাড়িয়ে ৫০ লাখ টাকা করার জন্য আসামিরা তিন লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরবর্তীতে গরু বিক্রি করে সেই টাকা দিলেও তাকে ঋণ দেওয়া হয়নি এবং টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি।
মামলার এজাহারে পাঁচজনকে সাক্ষী হিসেবে দেখানো হলেও, তাদের মধ্যে অন্যতম প্রথম দুজন সাক্ষী এ ঘটনার বিষয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
মামলার এক নম্বর সাক্ষী ডেমুরা গ্রামের মো. বাবুল মিয়া জানান, তিনি এই মামলার বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং সাক্ষী হওয়ার বিষয়টি মামলার আগে জানানো হয়নি। একইভাবে মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী শফিকুল ইসলামও জানান, আসামিদের সাথে বাদীর কোনো লেনদেন তার সামনে হয়নি এবং তিনি এই বিষয়ে অবগত নন।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বারহাট্টা শাখার মূখ্য কর্মকর্তা আল বারী উল মোসাব্বের এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিনের সাথে কথা বললে তারা মামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
সরেজমিনে ব্যাংক কর্মকর্তাদ্বয়ের দেখানো ব্যাংক স্টেটমেন্ট, খেলাপি ঋণ পরিশোধের একাধিক চিঠি ও ঋণের পরিশোধের জন্য উকিল নোটিশ এসকল পত্রাদি মামলা দায়েরের অনেক আগেই চলতি ও গত বছরের বিভিন্ন তারিখে বাদীকে প্রেরণ করার সত্যতা পাওয়া গেছে।
ব্যাংকের ওই দুজন কর্মকর্তা প্রতিবেদককে জানান, কামাল তালুকদারের ‘আলপনা মৎস্য খামার’ নামে একটি প্রকল্পের বিপরীতে ২০২৩ সালে সাত লাখ টাকার একটি ঋণ ছিল, যার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। সেই ঋণ পরিশোধ না করে তিনি নতুন করে ৫০ লাখ টাকার ঋণের আবেদন করেন। কিন্তু তার বন্ধকী সম্পত্তির সর্বোচ্চ ঋণসীমা (এমসিএল) আসে মাত্র ১২ লাখ টাকা। মামলা দায়েরের পূর্বেই গ্রাহকের অতীত ট্র্যাক রেকর্ড ভালো না হওয়া এবং প্রকল্পটির এতো বড় ঋণের জন্য ফিজিবল (গ্রহণযোগ্যতা) না হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের (জিএম অফিস) কাছে বাদীর ঋণসীমা নবায়ন ও বর্ধিতকরণে প্রতিবন্ধকতার বিষয়টিও অবগত করা হয় এবং ব্যাংক থেকে নিয়ম অনুযায়ী তাকে একাধিকবার ঋণ পরিশোধ চিঠিসহ লিগ্যাল নোটিশও পাঠানো হয়েছিল।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের দাবি, অন্যায্যভাবে বিশাল অংকের ঋণ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে এবং ব্যাংককে চাপে রাখতেই বাদী উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এমন ধরনের কাল্পনিক ঘুষের গল্প সাজিয়ে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেছেন বাদী।
এ বিষয়ে মামলার বাদী কামাল তালুকদারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। সাক্ষীদের অজ্ঞতার বিষয়টি সামনে আনলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, “যারা সাক্ষী, তারা জানে কি জানে না, সেটা সাক্ষ্য দেওয়ার ব্যাপার। যখন সাক্ষীর সময় হবে, তখন আমি সাক্ষী হাজির করব। আপনি কি সাক্ষীর আগেই সাক্ষী নিতে চাচ্ছেন?”
ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি (কামাল তালুকদার) বলেন, “আমার যা বলার এজাহারে লেখা আছে। আদালত যা সিদ্ধান্ত দেওয়ার দেবেন।” ফোনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি প্রতিবেদককে সরাসরি দেখা করার কথা বলেই সংযোগ কেটে দেন।
মামলাটির বিষয়ে জানতে পিবিআই-এর পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, ২৪ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) মামলার নথিপত্র হাতে পেয়েছি এবং একজন ভালো অফিসারের কাছে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হবে। তদন্ত শেষে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করেই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা জানান তিনি।
