লন্ডনে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশের মাটিতে পা রেখে তারেক রহমান ঘোষণা দিলেন- ‘দেশের মানুষের জন্য আমার একটি পরিকল্পনা আছে’। বাংলাদেশের মানুষ সেই পরিকল্পনায় বিশ্বাস রাখলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই বিশ্বাস আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে সরকার গঠন করল।
নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট বার্তা দিল; দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকলেও স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকলে মানুষের অবিচল আস্থা অর্জন করা সম্ভব।
আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ৩৫ বছরের ইতিহাসে দেশের প্রথম পুরুষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন তিনি। এক বছর আগেও তিনি ছিলেন নির্বাসনে, কিন্তু তার দৃঢ় মনোবল ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে বিএনপি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরল।
১৭ বছরেরও বেশি সময় নির্বাসনে থাকা একজন নেতা কীভাবে এত দৃঢ় আস্থা অর্জন করলেন? তরুণ প্রজন্ম তাকে মূলত ডিজিটাল মাধ্যমে চেনে। কীভাবে তিনি তাদের সমর্থন পেলেন? এর উত্তর খুঁজতে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার প্রতিটি ধাপ বোঝা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রোথিত উত্তরাধিকার
তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথপরিক্রমা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও মধ্যপন্থী রাজনীতির পক্ষে ছিলেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে জিয়াউর রহমান শহীদ হন। তখন খালেদা জিয়া ছিলেন পুরোদস্তুর গৃহিণী।
জাতির দুর্দিনে তিনি রাজনীতিতে আসতে বাধ্য হন। বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরলেন এবং স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এক পর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি বিভক্ত বিএনপিকে পুনর্গঠন করেন, নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পান এবং সেনাসমর্থিত শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। বহুবার গ্রেপ্তার, অসুস্থতা এবং দীর্ঘ কারাবাসের পরও রাজনৈতিক পরিসরে তিনি শক্ত অবস্থান ধরে রাখেন।
২০০৮ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসনে যান। ১৭ বছরের বেশি সময় সেখানে থাকলেও তিনি সবসময় দেশের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখেন। দূর থেকে বিএনপিকে নেতৃত্ব দেন, দলের ঐক্য রক্ষা এবং সংগঠনকে পুনর্গঠনে কাজ করেছেন। দূরত্ব তাকে ফ্রন্টলাইন নেতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলবিদে পরিণত করে।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও পরিকল্পনা
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরেন তারেক রহমান। মাতৃভূমিতে পা রেখেই তিনি জাতিকে সহজ বার্তা দেন- ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’।
তাঁর এই পরিকল্পনার কথা ভোটারদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। যার স্লোগান ছিল- ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়, যেখানে উন্নয়নের সুফল শুধু নির্বাচিত কিছু মানুষের জন্য নয়, সব নাগরিকের জন্য।
তারেক রহমানের পরিকল্পনার ভিত্তি হলো রাষ্ট্র মেরামতে বিএনপির ৩১ দফা রূপরেখা। যার মধ্যে রয়েছে- গণতান্ত্রিক ভারসাম্য পুনঃস্থাপন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা, দুর্নীতি দমন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। এসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কাঠামোগত পরিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরে।
নারীর ক্ষমতায়ন: সাহসী বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি
প্রতিদ্বন্ধী দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী নারীদের কাজের সময় দৈনিক পাঁচ ঘণ্টায় সীমিত করার প্রস্তাব করে। কিন্তু বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচারে নারীদের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়। বিশেষ করে গ্রাম ও নিম্নআয়ের এলাকায় নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়।
তারেক রহমানের পরিকল্পনায় অগ্রাধিকারমূলক একটি উদ্যোগ হলো ফ্যামিলি কার্ড, যার মাধ্যমে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে নারীদের হাতে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থসেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।
কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষিবিমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে।
পাশাপাশি হেলথ কার্ড কর্মসূচি স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করবে, স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শক্তিশালী করবে, মাতৃত্ব ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা উন্নত করবে এবং অধিকাংশ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী হবেন নারীরা।
নগরীতে নারীদের জন্য বিশেষ বাস সেবা ও কর্মজীবী মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার সুবিধাও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারেক রহমান।
কর্মসংস্থান, সুযোগ ও সুশাসন
বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণসহ মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১০ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থার সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং ও ক্ষুদ্র শিল্পে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য ভাতা, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, গ্রামীণ নারীদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। শিক্ষা ও যুব উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানসম্মত শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করা হবে।
নতুন অধ্যায়ের সূচনা
রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন বদলে গেছে। তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। লন্ডনে দীর্ঘ নির্বাসন থেকে দেশের সর্বোচ্চ পদে উন্নীত হওয়ার তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা অনন্য। পারিবারিক উত্তরাধিকার হয়তো তার জন্য ক্ষমতার দ্বার উন্মুক্ত করেছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে কার্যকরী শাসন ব্যবস্থা।
পরিকল্পনা প্রস্তুত। জনগণের ম্যান্ডেট স্পষ্ট। প্রত্যাশা অনেক- যেটি বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে সবসময়ই থাকে। এখন আর প্রশ্ন নেই যে তাঁর কোনো পরিকল্পনা আছে কি না।
এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কীভাবে সেই প্রত্যাশা পূরণ করবেন, সেটাই মূল প্রশ্ন। বহু জটিল চ্যালেঞ্জের মধ্যে তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবেন এই প্রত্যাশা সকলের।
