দীর্ঘ সংগ্রাম আর অপেক্ষার ক্ষণ পেরিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বড় রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পাওয়া এই ম্যান্ডেট দলটিকে এককভাবে দেশের সংবিধান সংশোধনসহ সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫১টি আসনে বিজয়ী হলেই সরকার গঠন করা যায়। অর্থাৎ মোট আসনের ৫০ দশমিক ৩৩ শতাংশ আসনে জয়ী হলেই সরকার গঠন করতে পারে একটি দল। সেই হিসাবে ৬৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ আসনে বিশাল জয় নিয়েই এবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।
বিএনপির এই নিরঙ্কুশ জয়ে উল্লসিত দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। সবমিলিয়ে বিএনপিতে বইছে স্বস্তির সুবাতাস। এখন অপেক্ষা শুধু সরকার গঠন ও শপথ গ্রহণের। অপেক্ষা নতুন মন্ত্রিসভার। আজ মঙ্গলবার বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নেবে। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এ শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পেছনে কাজ করেছে নানা কারণ। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে- একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ক্যারিশম্যাটিক লিডারশিপ, দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের মাধ্যমে দলের লাখো নেতাকর্মী নির্যাতনের শিকার, দলের অটুট ঐক্য, দলের প্রয়াত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও জিয়া পরিবারের সীমাহীন ত্যাগ।
তবে এ বিজয়ের পেছনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো দলের কাণ্ডারী তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফেরা এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় নেতৃত্ব প্রদান- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা।
নির্বাচনী প্রচারে তাঁর নেতৃত্ব, দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক পুনর্গঠন বিএনপিকে নতুন করে প্রাণবন্ত করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমান কেবল নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করেননি, বরং দলকে দীর্ঘদিন পর একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রোডম্যাপ দিয়েছেন। এই রোডম্যাপের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে- গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা।
তারেক রহমানের নেতৃত্ব বিএনপির ভেতরে নতুন উদ্দীপনা এনেছে, প্রজন্মান্তরের নেতাদের দলীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করেছে এবং ভোটারদের মনে পরিবর্তনের আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে যুবসমাজ ও নারীদের মধ্যে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং সক্রিয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ লক্ষ করা গেছে।
এছাড়াও তারেক রহমানের বৈচিত্র্যময় নির্বাচনী প্রচার, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং তৃণমূলকে বিবেচনায় নেওয়াসহ সময়োপযোগী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, যেমন- ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বা কৃষিঋণ মওকুফ করাসহ মানুষের প্রত্যাশা মাফিক প্রতিশ্রুতি বিএনপির ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলেছে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করার ফলে দলটির সাংগঠনিক শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি যেভাবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামলেছেন এবং যোগ্যদের মূল্যায়ন করেছেন, তা দলের ভেতরকার দীর্ঘদিনের কোন্দল নিরসনে জাদুর মতো কাজ করেছে। তারেক রহমানের এই পরিপক্ক ও নমনীয় নেতৃত্বই মূলত বিএনপিকে একটি আধুনিক ও জনমুখী দল হিসেবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। নিজের প্রতিটি বক্তব্যে তারেক রহমানের পরিমিত শব্দচয়ন ও প্রতিপক্ষের প্রতি সহনশীল আচরণ সাধারণ ভোটারদের মনে বিএনপির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের নেপথ্যের কারণ ও নির্বাচন প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, এ নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের নেপথ্যে রয়েছে তারেক রহমানের বুদ্ধিভিত্তিক নেতৃত্ব। তিনি লন্ডনে বসে নির্বাচন নিয়ে কিছুটা গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে এসেছেন, যেমন প্রার্থী চূড়ান্ত করা। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তারেক রহমান ও তার টিম মোটামুটি তৃণমূলের প্রত্যাশাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এছাড়াও তারেক রহমানের বৈচিত্র্যময় নির্বাচনী প্রচার, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং তৃণমূলকে বিবেচনায় নেওয়াসহ সময়োপযোগী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মানুষকে বিএনপির ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলেছে।
দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, রক্তক্ষয় ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশে উদারপন্থী গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে। এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে দেশের ১৮ কোটি মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপির এই বিজয় এক দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল। এছাড়াও চব্বিশের জুলাই ও আগস্টে প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থী, নারী ও শিশুর আত্মাহুতি এবং রক্তপাতের পর আমরা আজ গণতন্ত্রের প্রধান ফটকে উপনীত হয়েছি। এই বিজয় সেইসব শহীদের রক্তের ঋণ।’
তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এটা প্রমাণিত হয়েছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যেমন ঐক্যবদ্ধ, ঠিক তেমনিভাবে ১৮ কোটি মানুষও আজ ঐক্যবদ্ধ। তিনি বাংলাদেশের মানুষকে নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছেন— একটি পরিবর্তিত, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন। আমরা সেই নতুন সূর্যের আলোয় আলোকিত হতে চাই।’
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম এই নির্বাচনে বড় ম্যান্ডেট পাওয়া এই দলটির ওপর এখন জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার চাপও রয়েছে বেশি। এই নির্বাচনকে ঘিরে ঐক্য এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়েই মূল প্রত্যাশা রয়েছে সাধারণ মানুষের। ভোটের পরে মানুষের মধ্যে স্বস্তি কাজ করছে। দেশের রাজনীতি স্থির হবে, অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরবে, এমন আশা-প্রত্যাশার কথা আসছে।
বিএনপির এই বিজয়কে দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের বিজয় বলেছেন তারেক রহমান। নির্বাচনে জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সিঁড়িতে পা ফেলা বিএনপি চেয়ারম্যান সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘বিভক্তির বদলে ঐক্য ও শান্তি, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই তাদের সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হবে।’ জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও করেছেন তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূ-রাজনীতিতে আঞ্চলিক ও বৃহত্তর পরিসর- দুটি ক্ষেত্রেই ব্যালান্স করাটা বিএনপি সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। আঞ্চলিক দিক থেকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে ভারতের সঙ্গে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক টিকে রয়েছে।
তবে পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে, যা অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমানও হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। দেশটির সঙ্গেও আওয়ামী লীগ সরকারের একটা ভাল সম্পর্ক ছিল। চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যালান্স করে চলাটা আওয়ামী লীগের জন্যও বেশ চ্যালেঞ্জের ছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, যদিও ভারত এখন সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদ অনুভব করছে। বিএনপির রাজনৈতিক সরকার সেই সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু সেখানে সমস্যাটা হতে পারে পাকিস্তানকে ঘিরে। এছাড়া একইসঙ্গে চীন ও ভারতের মধ্যে ভাল সম্পর্ক অব্যাহত রাখাটাও বিএনপির জন্য কঠিন হতে পারে। এছাড়াও বিশ্ব পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে, সেটিও একটি চ্যালেঞ্জ।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নবনির্বাচিত এমপি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা কখনোই একটি দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ব না। দেশ ও জনগণের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা রক্ষা করে বিএনপির নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত-পাকিস্তানসহ সব দেশের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক রক্ষা করবে।’
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়া দল বিএনপি সর্বশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। সেই সময় দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছিল। ওই নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক জয় পেয়েছিল ১৯৫টি আসনে। আর এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীই ছিল বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে ভোটের মাঠে বিএনপির কাছে বিশাল ব্যবধানে হেরেছে জামায়াত। ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ৬৮টি আসনে। মিত্ররা পেয়েছে আরও ৯টি আসন।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফাপত্র প্রদানের মাধ্যমে অষ্টম জাতীয় সংসদের মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে। এর আগে বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৯ বছর এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালেও স্বল্প সময়ের জন্য সরকার গঠন করেছিল বিএনপি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দলের চেয়ারপার্সনের পদটি শূন্য হয়। সম্প্রতি তারেক রহমানকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করে দলের স্থায়ী কমিটি। তাঁর নেতৃত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি। প্রথমবার দলের নেতৃত্ব পেয়েই বিপুল ব্যবধানে জয় এনে দিলেন তারেক রহমান।
