শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈষম্য, আন্দোলন-সংগ্রাম, গণ-অভ্যূত্থান ও প্রত্যাশার পর অবশেষে ব্যালটের মাধ্যমে জনগণ তাদের রায় প্রদান করেছে। প্রাথমিক ফলাফলে জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজয় অর্জন করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা অতিক্রম করে এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থানে পৌঁছে যাওয়া শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
এই নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি ছিল আস্থার পুনর্গঠন, গণতন্ত্রের পুনর্স্থাপন এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে সহিংসতা, অনিয়ম, বর্জন বা রাজনৈতিক অস্থিরতার উদাহরণ কম নয়। সেই প্রেক্ষাপটে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক বার্তা বহন করে। ভোটার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য; নারী, তরুণ এবং প্রথমবারের ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো।
নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে একটি তুলনামূলক স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত হয়েছে বলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি থাকলে বাংলাদেশে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব। জনাব তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
প্রবাসে অবস্থান করেও তিনি দলকে সংগঠিত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। গত কয়েক বছরে বিএনপি যে পুনর্গঠন, তৃণমূল পুনরুজ্জীবন এবং নীতিগত অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করেছে, তার পেছনে জনাব রহমানের কৌশলগত ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ধৈর্য্য ও পরিকল্পনামাফিক বক্তব্য ও নির্দেশনা সর্বমহলে প্রসংশিত হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি তিনটি বড় বার্তা সকলের সামনে এনেছে, তা হলো—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান, এবং ডিজিটাল ও মানবসম্পদভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল।
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের কাছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ও প্রযুক্তি—এই তিনটি প্রতিশ্রুতি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তাছাড়া রাষ্ট্র মেরামতের যে ধারণা তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি সামনে এনেছে, তা একটি পরিবর্তনকামী মানসিকতার প্রতিফলন। নির্বাচনী ফলাফলের প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শহরাঞ্চল ও তরুণ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিএনপির প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সংকটকে প্রধান ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করেছে। গ্রামীণ এলাকাতেও ভোটের আচরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রচারণা এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তরুণ ভোটাররা প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষণের চেয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও নীতিনির্ভর বক্তব্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
এটি বোঝা যায় যে, ভোটাররা শুধু দল নয়, দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা বেছে নিতে চেয়েছেন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি সরকারের জন্য যেমন সুযোগ, তেমনি বড় দায়ও। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী কণ্ঠ দুর্বল হলে সরকারের ওপর আত্মসমালোচনার চাপ কমে যায়। তাই গণতন্ত্রের স্বার্থে নতুন সরকারের উচিৎ হবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক আচরণ নিশ্চিত করা।
বিএনপি সরকার গঠনের পর, তাদের সামনে থাকবে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ; অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, দুর্নীতিরোধ ও প্রশাসনিক সংস্কার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিতকরণ। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য কেবল নির্বাচনে নয়, বরং নির্বাচনের পর বিরোধীদল ও ভিন্নমতকে সম্মান দেওয়ার মধ্যেও নিহিত। তাই বিজয়ের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক আচরণ প্রদর্শন করাই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যূত্থানের মূল স্পিরিটকে ধারণ করে, এই মুহূর্তে বিএনপির সামনে প্রধান অগ্রাধিকার হতে পারে: অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বৈষম্য ও দুর্নীতি বিরোধী কার্যকর পদক্ষেপ, বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা।
যদি নিরঙ্কুশ বিজয়কে দলীয় প্রাধান্য হিসেবে না দেখে, বরং জাতীয় ঐক্যের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়—তবে এটি হতে পারে একটি বড় ইতিবাচক মোড়। জনাব রহমানের নেতৃত্বে যদি সরকার বিরোধী দলকে সংসদে কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দেয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে এবং নাগরিক অধিকারের পরিসর প্রসারিত করে, তবে এই নির্বাচন ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে। নতুন সরকারকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ—এসব ইস্যুতে কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। জনাব রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার কেমন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করবে, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গভীর আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ। শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ এবং সম্ভাব্য ক্ষমতার পরিবর্তন গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এখন প্রশ্ন একটাই: এই বিজয় কি সত্যিই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে? নিরঙ্কুশ বিজয় প্রত্যাশা বাড়ায়, কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ করাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সংস্কার, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা—এসবই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। যদি নতুন সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে, তবে নির্বাচনে বিএনপির এই বড় বিজয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
এটি হতে পারে একটি নতুন রাজনৈতিক চুক্তির সূচনা, যেখানে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পুনরায় সংজ্ঞায়িত হবে আস্থা, জবাবদিহিতা ও উন্নয়নের ভিত্তিতে। ব্যালটের শক্তি যে বুলেটের চেয়ে বড়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়তো আবারও সেই বার্তাই দিল। বাংলাদেশ এখন অপেক্ষায়—একটি দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার এবং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই শ্লোগান কেবল মুখে নয়, অন্তরে ধারণ করতে হবে; তাহলেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আমাদের সকলের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠবে। এখন সময়—নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে গণতান্ত্রিক প্রজ্ঞায় রূপান্তর করার। – লেখক: ড. এম এম রহমান অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ। ই-মেইল: mijan@jkkniu.edu.bd, mijanjkkniu@gmail.com
