লোকমান আহমদ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন বাস্তবতা ও বিস্তৃত আলোচনা। প্রায় সাড়ে তিন দশক পর দেশ পেতে যাচ্ছে একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী। তা নিয়েই চলছে জোর জল্পনা। বিশেষ করে প্রধান দুই রাজনৈতিক ধারার শীর্ষ পর্যায়ে এখন পুরুষ নেতৃত্ব সামনে থাকায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। দীর্ঘদিনের ‘দুই নেত্রীর’ অধ্যায়ের অবসানের প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ভিন্নমাত্রার আগ্রহ।
এবারের নির্বাচনী সমীকরণে আরও একটি দিক আলোচনায় এসেছে। দেশের দুই প্রভাবশালী রাজনৈতিক ধারার শীর্ষ দুই নেতা-জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান-দু’জনের নামের শেষেই রয়েছে ‘রহমান’। দুই নেতার সঙ্গেই সিলেট অঞ্চলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ডা. শফিকুর রহমানের বাড়ি সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায়। আর তারেক রহমানের শ্বশুরবাড়ি সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলায়। ঐতিহ্যগতভাবে প্রবাসী অধ্যুষিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন অঞ্চল হিসেবে সিলেট বরাবরই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে এবারের নির্বাচনে সিলেটকে ঘিরে বাড়ছে বিশ্লেষণ ও প্রচারণা। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, নামের মিলের চেয়ে রাজনৈতিক কৌশল ও জনসমর্থনই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে ফলাফল। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত-তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাদ দিলে-দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দুই নারী নেতা: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। পালাক্রমে ক্ষমতায় থাকা এই দুই নেত্রীর নেতৃত্বে দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে প্রায় ৩৬ বছর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি ছিল বাংলাদেশের ‘দুই নেত্রীর যুগ’।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা দলটির অনুপস্থিতিতে ক্ষমতার সমীকরণে তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা। অন্যদিকে, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু দেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান। দলটি নির্বাচনে বিজয়ী হলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন-এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের আগে সর্বশেষ পুরুষ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কাজী জাফর আহমদ (১৯৮৯-১৯৯০)। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
পরবর্তী সময়ে শাহ আজিজুর রহমান, আতাউর রহমান খান, মিজানুর রহমান চৌধুরী, মওদুদ আহমদ ও কাজী জাফর আহমদের মতো নেতারা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দীর্ঘ সময় দেশের নেতৃত্বে ছিলেন দুই নারী-খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। বিশ্লেষকদের অভিমত, ‘দুই নেত্রীর যুগ’ শেষ হওয়া মানেই রাজনৈতিক মেরুকরণের অবসান নয়। বরং নতুন নেতৃত্বের অধীনে রাজনীতির চরিত্র কীভাবে বদলাবে-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সমঝোতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সুশাসনের পথে দেশ এগোতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের ফলাফল ও নতুন সরকারের নীতিগত অবস্থানের ওপর।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি ভোটযুদ্ধ নয়; এটি এক যুগের অবসান এবং সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা। প্রায় ৩৬ বছর পর দেশের রাজনীতিতে পুরুষ নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন ঘটবে কি না-এর উত্তর মিলবে জনগণের রায়ে। এখন সবার দৃষ্টি সেই প্রতীক্ষিত ভোটের ফলাফলের দিকে।
