তিমির বনিক,মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
‘দেশের চাবি আপনার হাতে’-এই উদাত্ত আহ্বানে দেশব্যাপী সাংবিধানিক গণভোটের দামাঢোল বাজালেও মৌলভীবাজারের চা বাগান ও প্রান্তিক জনপথে নেই কোন প্রতিধ্বনি। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই ঐতিহাসিক গণভোট। তবে প্রচারণার ঘাটতির জন্য জেলার ৯২টি চা বাগানের কয়েক লাখ শ্রমিক এবং গ্রামগঞ্জের সাধারণ ভোটাররা আজ ও জানেন না ‘গণভোট’ আসলে কী।
তথ্য সূত্র মতে কমলগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি চা বাগানগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, সংসদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ থাকলেও ‘গণভোট’ শব্দটি অধিকাংশ মানুষের কাছেই সম্পূর্ণ অপরিচিত। তারা জানেন প্রার্থীরা এমপি পদের জন্য ভোট চাইছেন, কিন্তু একই দিনে যে আরেকটি আলাদা ব্যালটে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে হবে, সে বিষয়ে তাদের নূন্যতম ধারণা নেই।
পাত্রখোলা চা বাগানের শ্রমিক বিপুল কুর্মী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, আমরা শুধু জানি এমপি নির্বাচন হবে। সংসদ নির্বাচনের সাথে যে আরও একটা আলাদা ভোট আছে, সেটা কেউ আমাদের বলেনি। আগে কখনো গণভোট দেইনি, তাই এটা কীভাবে দিতে হয় তাও জানি না। তবে আমাদের সমাজে শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা আমাদের মত করে গণভোটের বিষয় প্রচার করছি। সরকারের পক্ষ থেকে ডিজিটাল বিলবোর্ড ও প্রচার যানের মাধ্যমে প্রচারণা চালানোর কথা থাকলেও মৌলভীবাজারে তা কেবল জেলা শহরের প্রধান সড়কেই সীমাবদ্ধ।
অথচ চা বাগানের মতো দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া জনপদে প্রচারণার কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন,”চা শ্রমিকরা এই দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্র সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে প্রচারণাকে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। শুধু শহরে ব্যানার টানিয়ে প্রান্তিক মানুষকে সচেতন করা সম্ভব নয়।” প্রচারণার এই সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও।
মৌলভীবাজারের তথ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানান, প্রচারণা কার্যক্রম মূলত পিআইবি থেকে পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি বর্তমানে জেলা শহরকেন্দ্রিক রাখার নির্দেশনা রয়েছে। একই সুর জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা তৌহিদুজ্জামান পাভেলের কণ্ঠে। তিনি বলেন, “উপজেলা পর্যায়ে প্রচারণা ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে বিশেষ কোনো নির্দেশনা এখনো আমাদের কাছে পৌঁছায়নি।”
স্বাধীনতার পর এটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের চতুর্থ গণভোট। এবার চারটি মৌলিক সংস্কার প্রশ্নে জনগণের রায় চাওয়া হচ্ছে: ১. সংসদ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার সুষম বণ্টন। ২. মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পূর্ণ নিশ্চয়তা। ৩. প্রশাসনিক ক্ষমতা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছানো। ৪. ‘জুলাই জাতীয় সনদের’ ভিত্তিতে সংবিধানের আধুনিকায়ন।
রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণী এই চারটি বিষয়ে সাধারণ মানুষের মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকলেও সচেতনতার অভাবে সেই অধিকার কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকলেও প্রান্তিক ভোটারদের এই তথ্যহীনতা ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
