গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি:
এক সময় নির্বাচন এলেই গাইবান্ধা শহর ও গ্রামাঞ্চলের দেয়াল, গাছের কাণ্ড আর আকাশভর্তি দড়িতে ঝোলানো ব্যানারে ছেয়ে যেত চারপাশ। সাদা-কালো পোস্টারে জমে উঠত নির্বাচনের চেনা আমেজ। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ছে না। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নতুন আচরণবিধিতে সব ধরনের পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় এবার প্রার্থীরা নামছেন পোস্টারবিহীন প্রচারণায়।
নির্বাচনী প্রচার শুরু হলেও রাস্তাঘাটে পোস্টার না থাকায় অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে নির্বাচনের ঐতিহ্যবাহী আবহ—এমনটাই মনে করছেন গাইবান্ধার স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে অন্যদিকে পোস্টারবর্জিত পরিবেশে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ ও পরিবেশকর্মীরা। তাদের মতে, পোস্টারের কারণে শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হতো এবং নির্বাচন শেষে সেগুলো বর্জ্যে পরিণত হয়ে পরিবেশ দূষণ বাড়াত।
গত ১০ নভেম্বর প্রকাশিত ইসির সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো প্রার্থী পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে সীমিত পরিসরে লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আগের মতো ব্যাপক ছাপার কাজ না থাকায় গাইবান্ধার বিভিন্ন ছাপাখানায় এখন বিরাজ করছে অলসতা।
গাইবান্ধা সদরসহ আশপাশের বাজার এলাকার কয়েকটি ছাপাখানা ঘুরে দেখা যায়, যেখানে আগে নির্বাচন এলেই দিনরাত ব্যস্ততা লেগে থাকত, সেখানে এখন কর্মীরা সময় কাটাচ্ছেন নিয়মিত বাণিজ্যিক কাজ নিয়ে। শহরের একটি প্রিন্টিং প্রেসের কর্মচারী আক্ষেপ করে বলেন, “আগে নির্বাচনের সময় দম ফেলার সময় পেতাম না। পোস্টার ছাপাতেই ব্যস্ত থাকতাম। এবার পোস্টার না থাকায় কাজ অনেক কমে গেছে।” এক প্রেস মালিক জানান, কিছু লিফলেট ও হ্যান্ডবিলের অর্ডার এলেও তা আগের তুলনায় খুবই সামান্য। তিনি বলেন, “পোস্টারই ছিল আমাদের প্রধান আয়ের উৎস।
এবার সেই কাজটাই নেই, শ্রমিকদের নিয়মিত কাজ দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।” গাইবান্ধা শহরের সার্কুলার রোড এলাকার ঘাঘট প্রেসের মালিক আব্দুস সামাদ সরকার বাবু জানান, আগের নির্বাচনগুলোতে পোস্টার ছাপিয়েই বছরের বড় অংশের আয় হতো। তিনি বলেন, “নির্বাচন আসলে ঋণ করে হলেও কাগজ কিনতাম, কারণ জানতাম কাজ হবে। এবার পোস্টার না থাকায় আয় একেবারেই নেই। বিদ্যুৎ বিল আর শ্রমিকের মজুরি কীভাবে দেব বুঝতে পারছি না।”
মিলন অফসেট প্রেসের মালিক মিলন মিয়া জানান, নির্বাচন কমিশন ভোটের প্রচারে পোস্টার নিষিদ্ধ করেছে, এমন তথ্য জানেন না বেশির ভাগ ছাপাখানা মালিক। পোস্টার ছাপার কাজ পাওয়ার আশায় আগেভাগেই কাগজ কিনে রেখেছেন তাঁরা। অনেকে চড়া দামে এই কাগজ কিনেছেন। কিন্তু কাজের অর্ডার মিলছে না। একই এলাকার ‘দেশ প্রিন্টিং প্রেস’-এর ব্যবস্থপক জানান, পোস্টার ছিল ছাপাখানার প্রাণ।“লিফলেট আর হ্যান্ডবিলের কাজ যা আসছে, তা দিয়ে মেশিন চালানোর খরচই ওঠে না। অনেক শ্রমিককে ছুটি দিতে হয়েছে।
এটা আমাদের জন্য খুব কষ্টের।” তবে ছাপাখানা মালিকরা বলছেন, পরিবেশ রক্ষার সিদ্ধান্ত ভালো হলেও বিকল্প কাজ বা সহায়তা ছাড়া হঠাৎ পোস্টার নিষিদ্ধ করায় তারা বড় আর্থিক সংকটে পড়েছেন। তারা সরকারের কাছে প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন।
গাইবান্ধা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাবুল আকতার বলেন, পোস্টারবিহীন নির্বাচন দীর্ঘমেয়াদে শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখবে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে গাইবান্ধায় পোস্টারবিহীন নির্বাচন যেমন পরিবেশের জন্য স্বস্তির বার্তা এনেছে, তেমনি জীবিকার প্রশ্নে নতুন দুশ্চিন্তায় ফেলেছে ছাপাখানা মালিক ও শ্রমিকদের।
