ইমন সরকার, ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি:
ভোরের আলো ফোটার আগেই ভালুকার শিল্পাঞ্চলে ভেসে আসে কারখানার সাইরেন। সেই শব্দে ঘুম ভাঙে হাজারো শ্রমজীবী মানুষের যাদের জীবনের বড় অংশ জুড়ে আছে দায়িত্ব, ক্লান্তি আর সময়ের সঙ্গে প্রতিদিনের নিরবচ্ছিন্ন লড়াই। এই লড়াইয়ের মাঝেই অনেকের জীবনে থেমে গেছে পড়াশোনার পথ। সংসারের দায়, পারিবারিক সংকট কিংবা বাস্তবতার চাপে কেউ দশ-পনেরো বছর আগেই স্কুল ছেড়েছিলেন।
কিন্তু সেই থেমে যাওয়া জীবনগুলোকে আবার শিক্ষার মূল স্রোতে ফেরাতে ভালুকার স্কয়ার মাস্টারবাড়ি এলাকায় নীরবে কাজ করে যাচ্ছে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘ই-লার্নিং একাডেমি বাংলাদেশ’। এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন তরুণ শিক্ষাউদ্যোক্তা এম এম রানা। তাঁর গড়ে তোলা এই একাডেমি কোনো প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক এক বাস্তবভিত্তিক ডিজিটাল শিক্ষাপ্ল্যাটফর্ম, যেখানে কর্মজীবী ও ঝরে পড়া মানুষরা বয়স, সময় কিংবা দীর্ঘ স্টাডি গ্যাপের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আবার পড়াশোনায় ফিরছেন। ভালুকা একটি শ্রমঘন শিল্পাঞ্চল। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, এখানে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষ বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত।
এদের বড় একটি অংশ মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারেননি। বাস্তবতা হলো দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কেবল শিক্ষাগত সনদের অভাবে অনেকেই বছরের পর বছর একই পদে আটকে থাকেন। এই সামাজিক বাস্তবতাই এম এম রানাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। রানা বলেন, নিজের চারপাশে তিনি দেখেছেন এমন অসংখ্য মানুষ, যারা কাজে পারদর্শী হলেও এসএসসি বা এইচএসসি সনদ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি কিংবা দায়িত্ব পাচ্ছেন না। বহু বছর আগে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ায় তাদের পক্ষে আর নিয়মিত কোনো স্কুল বা কলেজে যাওয়া সম্ভব নয়। এই দীর্ঘ স্টাডি গ্যাপে আটকে থাকা মানুষগুলোর হতাশাই তাঁকে বিকল্প এক শিক্ষামডেল গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করে।
ই-লার্নিং একাডেমির শিক্ষাব্যবস্থা সাজানো হয়েছে পুরোপুরি চাকরিজীবীদের বাস্তবতা মাথায় রেখে। দিনের কাজ শেষে রাতে অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হন শিক্ষার্থীরা। কেউ সরাসরি উপস্থিত থাকেন, কেউ আবার জুম বা গুগল মিটের মাধ্যমে যুক্ত হন। পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রয়েছে রেকর্ডেড ক্লাসের সুবিধা, যাতে কাজের চাপে কেউ পিছিয়ে না পড়েন। পাঠদানের ক্ষেত্রে জটিলতা এড়িয়ে সহজ ভাষা ও বাস্তব উদাহরণ ব্যবহার করা হয় যাতে দীর্ঘদিন পড়াশোনার বাইরে থাকা শিক্ষার্থীরাও আত্মবিশ্বাস ফিরে পান।
বর্তমানে এই একাডেমিতে ত্রিশ কিংবা চল্লিশ পেরোনো বহু শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করছেন। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অষ্টম শ্রেণি পাস ছাড়াই এসএসসি (ভোকেশনাল), বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ ও বিএসএস, পাশাপাশি চাকরিজীবীদের জন্য বিশেষভাবে পরিকল্পিত ‘এক বছরে এইচএসসি’ প্রোগ্রাম ইতোমধ্যে শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি ধারার বিভিন্ন কোর্সে ভর্তির গাইডলাইন ও একাডেমিক সহায়তাও দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে এমনকি প্রবাসীরাও ঘরে বসে তাদের অসমাপ্ত পড়াশোনা শেষ করার সুযোগ পাচ্ছেন। অনলাইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে ভীতি ও সংশয় কাজ করে, সেই জায়গা থেকে ই-লার্নিং একাডেমি বাংলাদেশ কাজ করছে শতভাগ স্বচ্ছতা ও আস্থার সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রচলিত আইন ও বিধি মেনে পরিচালিত।
তাদের রয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিটিসিএল কর্তৃক ভেরিফায়েড সরকারি ডোমেইন ( www.elearningacademy.org.bd ), হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএন সনদ। শিক্ষার্থীদের কাছে এম এম রানা পরিচিত ‘রানা স্যার’ নামে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গার্মেন্টস সুপারভাইজার জানান, দীর্ঘদিন ধরে তাঁর ধারণা ছিল এই বয়সে পড়াশোনা আর সম্ভব নয়। কিন্তু রানার দিকনির্দেশনা ও নিয়মিত অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হয়ে সেই ভয় কেটে গেছে।
এখন তিনি এইচএসসি শেষ করে ডিগ্রিতে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, দিনের বেলায় কারখানার কাজ আর রাতে পড়াশোনা এই দুইয়ের ভারসাম্য তাঁর জীবনে নতুন আত্মবিশ্বাস এনেছে। আগে যেখানে নিজেকে সীমাবদ্ধ মনে হতো, এখন সেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও দর্শন সম্পর্কে এম এম রানা বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শিক্ষার গণতান্ত্রিকায়ন। সার্টিফিকেটের অভাবে যেন কারো ক্যারিয়ার আটকে না থাকে।
একজন মানুষ তার সুবিধামতো সময়ে পড়াশোনা করবে এই বিশ্বাস থেকেই আমাদের যাত্রা। আমরা শুধু ভর্তি করাই না, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। আমাদের স্লোগান ‘যেখানে থেমেছে পথ, সেখান থেকেই হোক নতুন শুরু।’”
ভালুকার স্কয়ার মাস্টারবাড়ির এই ছোট্ট অনলাইন ক্লাসরুম আজ প্রমাণ করছে শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের জীবনের সম্ভাবনাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। সেই সম্ভাবনার দরজাই খুলে দিচ্ছেন এম এম রানা ও তাঁর ই-লার্নিং একাডেমি বাংলাদেশ। যোগাযোগ: মোবাইল: ০১৭৮৫-৫৫৭৫৮৭ ওয়েবসাইট:
ফেসবুক পেজ: E Learning Academy Bangladesh অফিস: স্কয়ার মাস্টারবাড়ি, বিকাশ অফিসের বিপরীতে, ভালুকা, ময়মনসিংহ
