নিজস্ব প্রতিবেদক: যে উঠানে একসময় একসঙ্গে হেসেখেলে দুরন্ত শৈশব কেটেছে, সেই উঠানই সাক্ষী হলো এক মর্মান্তিক ভ্রাতৃহত্যার। এক চিলতে জমির সীমানা আর ইট-পাথরের দেয়াল তোলার মতো নিতান্তই তুচ্ছ এক বিষয় চিরতরে কেড়ে নিল তরতাজা এক প্রাণ। আপন বড় ভাইয়ের লাঠির নির্মম আঘাতে রক্তে ভাসল পৈতৃক ভিটা। নিভে গেল ছোট ভাই সাইকুল ইসলামের (৩৫) জীবনপ্রদীপ। শুধু তাই নয়, স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন নিহতের স্ত্রী ও ১৫ বছর বয়সী কিশোরী কন্যা।
সোমবার (২ নভেম্বর) ভোরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন সাইকুল। এরআগে, গতকাল (রবিবার) বিকেলে নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার সিংধা ইউনিয়নের চন্দ্রপুর গ্রামে ঘটে যাওয়া এই অমানবিক ঘটনাটি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সামান্য সম্পদের লোভ কীভাবে রক্তের বাঁধনকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে।
চন্দ্রপুর গ্রামের মৃত আব্দুল খালেকের ছয় ছেলের সংসার ছিল এটি। সময়ের পরিক্রমায় জীবন ও জীবিকার তাগিদে ভাইয়েরা ছড়িয়ে ছিটেয়ে পড়েন বিভিন্ন জায়গায়। তিন ভাই পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়, একজন প্রবাসী এবং আরেকজন থাকেন বারহাট্টা শহরে। কেবল ৩৫ বছর বয়সী সাইকুল ইসলামই গ্রামের মাটির মায়ায় পৈতৃক ভিটা আঁকড়ে পড়েছিলেন। দিনভর কৃষিকাজ করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সাদামাটা জীবন ছিল তার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন আগে ঢাকা থেকে কাজের ফাঁকে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসেন বড় ভাই সাইদুর রহমান। বাড়িতে এসেই নিজের হিস্যার সীমানা নির্ধারণ ও সেখানে পাকা দেয়াল তোলার উদ্যোগ নেন তিনি। সীমানা নির্ধারণ নিয়েই ছোট ভাই সাইকুলের সঙ্গে তার মতবিরোধ দেখা দেয়। রবিবার বিকেলে এই নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে ক্ষোভে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন বড় ভাই সাইদুর।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে, ঝগড়ার একপর্যায়ে সাইদুর রহমান তার স্ত্রী ও ছেলে মিলে লাঠিসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন আপন ছোট ভাই সাইকুলের ওপর। নির্মমভাবে পিটিয়ে সাইকুলকে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। লাঠির একাধিক শক্ত আঘাত লাগে সাইকুলের মাথায়। চোখের সামনে স্বামীকে এভাবে মার খেতে দেখে ছুটে আসেন সাইকুলের স্ত্রী ও তার ১৫ বছরের মেয়ে। হামলাকারীদের হাত থেকে রেহাই পাননি তারাও। নারী ও শিশুর ওপরও চলে অমানবিক নির্যাতন।
পরে সাইকুল ও তার পরিবারের আর্তচিৎকারে আশপাশের প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। তাদের হস্তক্ষেপে হামলাকারীরা নিবৃত্ত হলে, মুমূর্ষু অবস্থায় সাইকুল এবং তার স্ত্রী-কন্যাকে উদ্ধার করে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন সাইকুল। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহত স্ত্রী ও মেয়ের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে কিছুটা উন্নতির দিকে।
মর্মান্তিক এই ঘটনায় চন্দ্রপুর গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোক ও স্তব্ধতা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সংশ্লিষ্ট সিংধা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাসিম তালুকদার। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, “তাদের ছয় ভাইয়ের মধ্যে একমাত্র সাইকুলই বাড়িতে থাকতো। কৃষিকাজ করে খেতো মানুষটা। সামান্য একটু সীমানার জায়গা নিয়ে কথা-কাটাকাটি, আর তা থেকে মারামারি করে তরতাজা একটা জীবন চলে গেল! এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে!”
বারহাট্টা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চম্পক দাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এটি একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। তিনি বলেন, “সাইকুলের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ মর্গে রাখা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।”
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় সোমবার দুপুরে নিহত সাইকুলের স্ত্রী বাদী হয়ে বড় ভাই সাইদুর রহমান, তার স্ত্রী ও ছেলের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত সাইদুর রহমান সপরিবারে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সম্পদের মোহ আজ রক্তের সম্পর্ককে যেন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। যে সীমানায় দেয়াল তুলে ভাইয়ে-ভাইয়ে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছিল, সেই সীমানার মাটিতে এখন কেবলই স্বজন হারানোর কান্না। এই শূন্যতা আর আক্ষেপ হয়তো চন্দ্রপুর গ্রামের মানুষকে তাড়িয়ে বেড়াবে বহুদিন।




