নিজস্ব প্রতিবেদক: শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে ঢাকা থেকে নিজ বাড়িতে এসে মর্মান্তিক ও ন্যাক্কারজনক ঘটনার শিকার হয়েছেন ৩৭ বছর বয়সী এক নারী পোশাক শ্রমিক। পূজার বিসর্জনের রাতে নিজ বসতবাড়িতে তিনি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। তবে স্থানীয় প্রভাবশালী কুচক্রী একটি মহল যখন ঘটনাটি টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার পাঁয়তারা করছিল, ঠিক তখনই পুলিশের সাহসী ও ত্বরিত পদক্ষেপে ভুক্তভোগী নারী উদ্ধার হন এবং আইনি সুরক্ষার আওতায় আসেন। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে তিন অভিযুক্তের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে প্রেরণ করেছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- দুর্গাপুর পৌরসভার মধ্যবাজার এলাকার বাবুল মিয়ার ছেলে হাসিবুল হাসান (২৫) এবং জালাল উদ্দিনের ছেলে হাফিজুল হাসান রাব্বি (২৬)। তবে অপর অভিযুক্ত, একই এলাকার মৃত সিদ্দিকের ছেলে ট্রাকচালক আশিক মিয়া (২৬) কৌশলে পালিয়ে যায়।
পুলিশ গ্রেপ্তারকৃত দুজনকে আদালতে হাজির করে তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে, যার শুনানি আগামী রবিবার (২৫ অক্টোবর) বা পরে যে কোন দিন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন এবং তিনিই নিজেই এ মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে সত্য উন্মোচনে কাজ করছেন।
পুলিশ ও এজাহার সূত্রে, ভুক্তভোগী (৩৭) পেশায় একজন গার্মেন্টস কর্মী এবং তার স্বামী ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তারা দুর্গাপুর পৌরসভার মধ্যবাজার (জিগাতলা) এলাকার বাসিন্দা। পূজার ছুটিতে তিনি বাড়িতে এসেছিলেন।
গত ২১ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জনের রাতে বিপিনগঞ্জ পূজামণ্ডপে পুরোহিতের দায়িত্ব পালন শেষে ভুক্তভোগীর খালাতো ভাই রাত বেশি হওয়ায় নিজ বাড়ি খালিয়াজুরিতে ফিরতে পারেননি। তাই তিনি রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ওই নারীর বাড়িতে আসেন এবং রাতের খাবার শেষে একটি কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন।
২২ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১২টা ১০ মিনিটের দিকে একই এলাকার তিন যুবক ওই নারীর ঘরের দরজায় কড়া নাড়ে। নারী দরজা খুলে দিলে ওই যুবকরা জোরপূর্বক ঘরে প্রবেশ করে। তারা ঘরে অবস্থানরত ভুক্তভোগীর খালাতো ভাইকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করা শুরু করে এবং ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা চালায়।
এরপর অভিযুক্তরা ভুক্তভোগী নারীকে জোরপূর্বক টানা হেঁচড়া করে বাড়ির রান্নাঘরের ভেতর নিয়ে যায়। সেখানে প্রথমে হাসিবুল হাসান এবং পরে মো. আশিক মিয়া ওই নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। তৃতীয় অভিযুক্ত হাফিজুল হাসান রাব্বি তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করলে ভুক্তভোগীর ডাক-চিৎকারে তার খালাতো ভাই ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অভিযুক্তরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পরদিন সকালে স্থানীয় একটি চক্র ঘটনাটি মীমাংসা করার নামে শালিসি বৈঠকের আয়োজন করে। মোবাইল ফোনে ধারণকৃত ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি রফাদফা করার জন্য চাপ দেওয়া হতে থাকে।
সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ এমন খবর জানতে পারেন। কালক্ষেপণ না করে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সাদা পোশাকে (লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায়) একজন কনস্টেবলকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। অত্যন্ত সুকৌশলে মীমাংসা বৈঠক শেষ করে বের হওয়ার মুহুর্তে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। ভুক্তভোগীর কথা শুনে ওসি তৎক্ষণাৎ দুজনকে আটক করেন এবং ভুক্তভোগী নারীকে সেখান থেকে উদ্ধার করে সরাসরি থানায় নিয়ে আসে।
এ ঘটনার গত ২২ অক্টোবর দিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে তিনজনকে আসামি করে ভুক্তভোগী নিজেই বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। ন্যাক্কারজনক ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে একটি মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার শুরু করে। ফেসবুকে এক ব্যক্তি পোস্ট দিয়ে দাবি করেন, সমাজের ‘অসঙ্গতি’ তুলে ধরতে ওই যুবকরা ভিডিও ধারণ করেছিল এবং পুলিশ সেই ভিডিও ডিলিট করে দিতে পারে।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, “অভিযু্ক্তরা দরজা খুললে অসংলগ্ন অবস্থা দেখতে পায়নি। অভিযুক্তরা মূলত ব্ল্যাকমেইল করে ফায়দা লুটতেই ভিডিও ধারণ করেছিল এবং জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছে”। তিনি আরও স্পষ্ট করেন, পুলিশকে বিতর্কিত করে আসামিদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই এমন মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন পেশাদারিত্ব ও ত্বরিত পদক্ষেপের কারণে বড় একটি অপরাধ ধামাচাপা পড়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে এবং একজন অসহায় নারী সঠিক আইনি বিচার পাওয়ার পথে অগ্রসর হতে পেরেছেন। পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।




