জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ও একুশে পদকপ্রাপ্ত এই বরেণ্য সাংবাদিক-সাহিত্যিকের জন্ম নেত্রকোনা সদর উপজেলার উলুয়াটি গ্রামে।
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য সাংবাদিক, সম্পাদক ও সাহিত্যিক মুজীবুর রহমান খাঁর ১১৬তম জন্মবার্ষিকী আগামীকাল ২৩ অক্টোবর, শুক্রবার। ১৯১০ সালের এই দিনে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বর্তমান নেত্রকোনা সদর উপজেলার উলুয়াটি গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম ইসমাইল উদ্দিন খাঁ এবং মা মরহুমা নজিরুন্নেসা খাতুন।
সাংবাদিকতা, সম্পাদনা, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাংবাদিকতা ও সাহিত্যাঙ্গনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন।
শিক্ষাজীবন
মুজীবুর রহমান খাঁ ১৯২৮ সালে নেত্রকোনার আঞ্জুমান হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৩৪ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
সাংবাদিকতা ও সম্পাদনা
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি তৎকালীন ২৪ পরগনার হারুয়া উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতাও শুরু করেন। ১৯৩৬ সালে কলকাতার সাপ্তাহিক মোহাম্মদী পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা হয়।
একই বছরের ৩১ অক্টোবর তিনি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সহসম্পাদক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৩৯ সালে যুগ্ম সম্পাদক হন। ১৯৪৮ সালে আজাদ ঢাকায় স্থানান্তরিত হলে তিনি সেখানেও একই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৩ সাল থেকে মাসিক মোহাম্মদীর সম্পাদনার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি আজাদ ও মোহাম্মদীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক পয়গাম পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে দৈনিক আজাদ পুনঃপ্রকাশিত হলে তিনি এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি
১৯৫৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ক্লাব, বর্তমান জাতীয় প্রেস ক্লাব, প্রতিষ্ঠিত হলে মুজীবুর রহমান খাঁ এর প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি অল বেঙ্গল অ্যান্টিফ্যাসিস্ট রাইটার্স গিল্ডের প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি, ১৯৪৪ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সম্পাদক এবং ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় গণপরিষদের সদস্য ছিলেন।
১৯৫৪ সালে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক এবং বুলবুল ললিতকলা একাডেমির সহসভাপতি ছিলেন। ১৯৫২ সালে তিনি মিশর এবং ১৯৫৪ সালে হল্যান্ড সফর করেন।
সাহিত্যকর্ম
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে বিলাতে প্রথম ভারতীয় (১৯৩৯), পাকিস্তান (১৯৪২), ইকনমিক প্রবলেম অব ইস্ট পাকিস্তান, সাহিত্যের সীমানা (১৯৬৭), সাহিত্য ও সাহিত্যিক (১৯৭১), মহানবী (১৯৮০), আমাদের ইতিহাস ও নয়া তারিখ।
সম্মাননা
সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মুজীবুর রহমান খাঁ পাকিস্তান সরকারের ‘সেতারা-ই-কায়েদে আজম’ পদকে ভূষিত হন। স্বাধীন বাংলাদেশেও তাঁর কৃতিত্ব যথাযথ স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৮০ সালে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন। এসব সম্মাননা তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন, সম্পাদনা ও সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
মৃত্যুর ৩৫ বছর পর, ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত ‘আমাদের আলোকমালায় অনেক আলো’ শীর্ষক প্রজ্ঞাজন সম্মাননা অনুষ্ঠানে মননশীলতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে মরণোত্তর ‘সৈয়দ আলী আহসান সিএনসি পদক’ প্রদান করা হয়। তাঁর পক্ষে পদক গ্রহণ করেন মেয়ে রোমানা নাসরিন কুমকুম।
প্রয়াণ
১৯৮৪ সালের ৫ অক্টোবর ৭৩ বছর বয়সে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন মুজীবুর রহমান খাঁ। তাঁকে ঢাকার বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
সাংবাদিকতা, সম্পাদনা ও সাহিত্যচর্চায় তাঁর অবদান দেশের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যাঙ্গনে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে তাঁর ভূমিকা এবং দীর্ঘ কর্মজীবন তাঁকে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছে।





