মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০

রুহুল আমিন,ডিমলা(নীলফামারী)

‘সু-খবর, সু-খবর, সু-খবর’—মাইকে ভেসে আসা এমন উচ্চশব্দে ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভাঙছে অনেকের। সকাল গড়িয়ে দুপুর, এরপর সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত বিরামহীন প্রচার। কখনো চিকিৎসকের উপস্থিতির ঘোষণা, কখনো কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন, আবার কখনো দোকান উদ্বোধন, মুরগির মাংস কিংবা মোবাইল সিম বিক্রির প্রচারণা। এসব মাইকিংয়ে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় ক্রমেই বাড়ছে শব্দদূষণ। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন।

উপজেলার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদ, হাটবাজার ও অভ্যন্তরীণ সড়ক—সবখানেই ভ্যান ও ইজিবাইকে মাইক-সাউন্ড বক্স বেঁধে চলছে প্রচারণা। উচ্চশব্দে এসব ঘোষণা ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। প্রচারের উদ্দেশ্য থাকলেও শব্দের মাত্রা ও সময়সীমা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভোরের দিকে শুরু হওয়া মাইকিং অনেক ক্ষেত্রে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে। বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে চিকিৎসকের উপস্থিতি জানানোর পাশাপাশি কোচিং সেন্টার, বিভিন্ন দোকান ও শোরুমের প্রচারেও ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চশব্দের মাইক। হারানো জিনিসের ঘোষণা থেকে শুরু করে পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন—সবকিছুতেই যেন মাইকই প্রধান ভরসা। এতে একদিকে জনসাধারণের ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পড়ার টেবিল থেকে বাজার—কোথাও স্বস্তি নেই
শব্দদূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিক্ষার্থী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ওপর। সকাল ও সন্ধ্যায় পড়াশোনার সময় মাইকের শব্দে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অসুস্থ ব্যক্তিদের বিশ্রামেও ব্যাঘাত ঘটছে। অন্যদিকে বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বাভাবিক কথাবার্তা বলতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা আলম বলেন, “উচ্চশব্দে মাইকিংয়ের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। প্রচারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সুবিধা-অসুবিধাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।”

শুটিবাড়ি বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুল বাতেন বলেন, “মাইকের বিকট শব্দে বাজারে ক্রেতাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সমস্যা হয়। ব্যবসার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে মাইকিংয়ের শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।”

ডালিয়া নতুন বাজার এলাকার মনোয়ার হোসেন বলেন, “সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাইকিং চলায় ঘরে থাকা অবস্থায়ও অনেক সময় স্বস্তি পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।”

চাপানিরহাট এলাকার আব্দুল করিমের ভাষ্য, উচ্চশব্দের কারণে শিশুদের পড়াশোনা এবং বয়স্কদের বিশ্রামে সমস্যা হতে পারে। তাই প্রচারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় ও শব্দের মাত্রা মেনে চলা উচিত।

শিক্ষার্থী নজরুল ইসলাম ও শিক্ষক আব্দুল জলিল জানান, সকাল ও সন্ধ্যায় পড়াশোনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মাইকের বিকট শব্দে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাঁরা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

প্রতিদিনের প্রচারে ব্যয় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাইকিং পরিচালনার জন্য ভ্যানচালকদের দৈনিক ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব প্রচারণা চালানো হয়। তবে শব্দের মাত্রা, প্রচারের সময় এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

প্রচারের প্রয়োজনে মাইক ব্যবহারের বিরোধিতা করছেন না বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, জনস্বার্থ ও ব্যবসায়িক প্রচারের মধ্যে ভারসাম্য রেখে শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট সময় মেনে প্রচার চালানো নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় উচ্চশব্দের ব্যবহার সীমিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।

দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে শ্রবণশক্তির ক্ষতি, ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ ও মনোযোগের ঘাটতির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও উদ্বেগজনক হতে পারে। ফলে শব্দদূষণকে শুধু বিরক্তির কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আতিকুর রহমান খান বলেন, অতিরিক্ত শব্দ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য উচ্চশব্দ ক্ষতিকর। তাই জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাইকিংয়ের শব্দমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

দেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ কার্যকর রয়েছে। এতে এলাকাভেদে শব্দের সর্বোচ্চ মানমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জনপরিসরে মাইক ও লাউডস্পিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য অনুমতি ও বিধিনিষেধ অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে এসব বিধান বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ডিমলাবাসী।

স্থানীয়দের মতে, শুধু নির্দেশনা জারি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, শব্দের মাত্রা পরিমাপ এবং বিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা। একই সঙ্গে প্রচার পরিচালনাকারীদের সচেতন করাও জরুরি।

এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান জানান, শব্দদূষণ রোধে শিগগিরই মাইকিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ লিখিত চিঠি দেওয়া হবে। নির্দেশনা অমান্য করে অনিয়ন্ত্রিত শব্দ সৃষ্টি করলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রচার-প্রচারণা জনজীবনের অংশ হলেও তা যেন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের প্রতিবন্ধক না হয়—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের। তাঁদের মতে, নির্ধারিত সময় মেনে এবং সহনীয় শব্দমাত্রায় মাইকিং পরিচালনা করা হলে প্রচারও চলবে, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও কমবে।

এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের ঘোষিত উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ডিমলায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে শিক্ষার্থীরা ফিরে পাবে পড়াশোনার পরিবেশ, অসুস্থ ও বয়স্ক ব্যক্তিরা পাবেন বিশ্রামের সুযোগ, আর সাধারণ মানুষও স্বস্তিতে দৈনন্দিন কাজ করতে পারবেন।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version