দ্য মেইল বিডি | অর্থনীতি ডেস্ক
মূল্যস্ফীতির হার কমা অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর হতে পারে। কিন্তু এতে কি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও কমে যায়? বাস্তবতা হলো, মূল্যস্ফীতির হার কমলেও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। আর মানুষের আয় সেই অনুপাতে না বাড়লে সংসার চালানোর চাপ কমার বদলে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানেও এই বাস্তবতার ইঙ্গিত মিলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২২ শতাংশে উঠেছে, যা আগের মাসে ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। অর্থাৎ, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার আবার বেড়েছে। অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। ফলে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত বিবিএস।
মূল্যস্ফীতি কমা মানেই কি দাম কমা?
অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি বলতে সাধারণভাবে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক মূল্যস্তর বৃদ্ধির হারকে বোঝায়। এই হার কমে যাওয়ার অর্থ হলো, আগের তুলনায় দাম বৃদ্ধির গতি কমেছে। এর অর্থ এই নয় যে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস কিংবা বাসাভাড়ার দাম আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে।
ধরা যাক, একটি পরিবারের মাসিক বাজার খরচ আগে ছিল ১০ হাজার টাকা। একপর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়ায় একই বাজার করতে খরচ দাঁড়াল ১২ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও দাম যদি আর না কমে, তাহলে ওই পরিবারকে আগের মতোই ১২ হাজার টাকা ব্যয় করতে হবে।
অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতির হার কমার সুফল পেতে হলে শুধু পরিসংখ্যানের পরিবর্তন দেখলেই চলবে না; দেখতে হবে পণ্যের বর্তমান দাম, পরিবারের আয় এবং ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তন।
আয় বাড়ছে, নাকি ব্যয় বাড়ছে বেশি?
সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বস্তি নির্ভর করে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধানের ওপর। বেতন বা মজুরি বাড়লেও সেই বৃদ্ধি যদি খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ বৃদ্ধির তুলনায় কম হয়, তাহলে পরিবারের হাতে প্রকৃত অর্থে বাড়তি টাকা থাকে না।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, আর জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। এই ব্যবধান ইঙ্গিত দেয় যে গড় মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি ছিল। তবে এই পরিসংখ্যান দিয়ে সব পরিবারের অবস্থা এক বলে ধরে নেওয়া যাবে না। যাঁদের আয় নির্দিষ্ট, যাঁরা দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল কিংবা যাঁদের আয় নিয়মিত বাড়ে না, তাঁদের পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে। আবার খাদ্য, বাসাভাড়া ও চিকিৎসার মতো খাতে বেশি ব্যয় করা পরিবারগুলোর ওপর চাপও তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
বাজারের স্বস্তি বুঝতে কোন বিষয়গুলো জরুরি?
মূল্যস্ফীতি কমার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা বুঝতে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম, মাছ ও সবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কোন দিকে যাচ্ছে, তা দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের বেতন, মজুরি এবং অন্যান্য আয় কতটা বাড়ছে, তা বিবেচনা করতে হবে। তৃতীয়ত, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়ের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার কমলেও কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবার দাম বেড়ে যেতে পারে। ফলে পরিসংখ্যানে স্বস্তি দেখা গেলেও অনেক পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ে সেই স্বস্তি নাও আসতে পারে।
নীতিনির্ধারকদের সামনে চ্যালেঞ্জ
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা অর্থনৈতিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। তবে একই সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আয়ের সুযোগ সম্প্রসারণও জরুরি।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম কার্যকর করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় কমানোর উদ্যোগও পণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোনো একটি পদক্ষেপেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং প্রকৃত আয় বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতি কমা অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এর প্রকৃত সুফল তখনই পৌঁছাবে, যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল হবে, আয় ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়বে এবং পরিবারগুলো একই আয়ে আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন মেটাতে পারবে। তাই অর্থনীতির সাফল্য শুধু মূল্যস্ফীতির হার দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। বাজারের দাম, আয় ও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এই তিনটির সম্মিলিত চিত্রই বলে দেবে, জীবনযাত্রার চাপ সত্যিই কমছে কি না।





