নিজস্ব প্রতিবেদক: একটি তরতাজা প্রাণ অকালে ঝরে যাওয়ার পর অবশেষে টনক নড়েছে সংশ্লিষ্টদের। সামান্য দাঁতের সমস্যার চিকিৎসা নিতে গিয়ে যখন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে এক কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়, তখন থেকেই জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল- কার হাতে আমরা আমাদের জীবন ও স্বাস্থ্যসেবা তুলে দিচ্ছি? সাধারণ মানুষের সেই উদ্বেগের জায়গা থেকেই নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন এবার মাঠে নেমেছে ভুয়া দন্ত চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য রুখতে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে মোহনগঞ্জ পৌরশহরের স্টেশন রোড সংলগ্ন পাথরঘাটা এলাকায় অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ‘মৌ ডেন্টাল কেয়ার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে উঠে আসে চিকিৎসাসেবার নামে অভিনব প্রতারণার চিত্র।
সেখানে দেখা যায়, চেম্বারে একজন সনদধারী দন্ত চিকিৎসকের নাম জ্বলজ্বল করছে। ভেতরে রোগীদের দাঁতের মতো স্পর্শকাতর অঙ্গের চিকিৎসা দিচ্ছেন সোহানুর রহমান সুরাপ ও এস এম রাহী নামের দুই ব্যক্তি। অথচ তাদের কাছে চিকিৎসা দেওয়ার মতো ন্যূনতম কোনো ডাক্তারি সনদ বা বৈধ কাগজপত্র ছিল না। এমনকি সাইনবোর্ডে যে চিকিৎসকের নাম লেখা, তাকেও সেখানে পাওয়া যায়নি।
অভিযানের সময় ধরা পড়ার পর ওই দুই ব্যক্তি প্রথমে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করেন। তারা দাবি করেন, চেম্বারটি মূলত ওই সনদধারী চিকিৎসকের। তারা সেখানে কোনো চিকিৎসা করেন না, কেবল রোগীদের সিরিয়াল দেওয়া ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন। তাদের দাবি ধোপে টেকেনি। অভিযান চলাকালেই তাদেরকে সরাসরি রোগীদের দন্ত চিকিৎসা দিতে দেখা যায়।
চিকিৎসা দেওয়ার বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়া এবং হাতেনাতে ধরা পড়ার পর ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের একজনকে ১০ হাজার এবং অপরজনকে ১৫ হাজার টাকা- অর্থাৎ, ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে মানুষের জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি না খেলার জন্য তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়।
প্রশাসনের এমন জোরালো তৎপরতার পেছনে রয়েছে মাস দুয়েক আগের এক হৃদয়বিদারক স্মৃতি। গত ১০ আগস্ট মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের একটি ডেন্টাল কেয়ারে দাঁতের চিকিৎসা নিতে গিয়েছিল ১৪ বছর বয়সী কিশোর মো. লিয়ন মিয়া। সেখানে দাঁতের মাড়ির পাশে বেড়ে ওঠা মাংস কাটার পর তার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। একপর্যায়ে চিকিৎসার অভাবেই তার মৃত্যু ঘটে বলে অভিযোগ ওঠে।
এই ঘটনাটি গণমাধ্যমে আসার পরই মূলত স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। সে সময় অভিযুক্ত ওই দন্ত চিকিৎসক গা ঢাকা দেন। তবে প্রশাসন অভিযান চালিয়ে পাশের আরেকটি ডেন্টাল কেয়ার থেকে একজনকে আটক করে কারাদণ্ড দেয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোর লিয়নের মৃত্যুর পর প্রশাসনের নজরদারি বাড়ায় ভুয়া চিকিৎসকরা এখন নতুন কৌশল অবলম্বন করেছেন। সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করতে তারা এখন সনদধারী চিকিৎসকদের নাম ও সাইনবোর্ডকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। চেম্বারগুলো নিবন্ধিত চিকিৎসকদের নামে হলেও, বাস্তবে তাদের অনুপস্থিতিতে হাতুড়ে ব্যক্তিরাই রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসা দিচ্ছেন। এমনকি কোথাও কোথাও সনদধারী চিকিৎসককে শুধু সামনে বসিয়ে রেখে আড়ালে অন্য ব্যক্তিরা চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতকদের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন। তিনি বলেন, “অভিযানের সময় ওই দুই ব্যক্তি চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনো বৈধ কাগজপত্রই দেখাতে পারেননি। তারা সিরিয়াল দেওয়ার কথা বলে দাবি করলেও, আমরা তাদের সরাসরি রোগীদের চিকিৎসা দিতে দেখেছি। এ কারণেই তাদের ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।”
মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না জানিয়ে ইউএনও আরও বলেন, “জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।”
চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকারের নামে যারা সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে বাণিজ্যের ফাঁদ পাতছেন, প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান তাদের জন্য একটি বড় বার্তা। সচেতন মহল মনে করছেন, প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে হয়তো আর কোনো লিয়নকে ভুল চিকিৎসার বলি হতে হবে না।




