নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রকৃতির ক্যানভাসে এখন শরতের স্নিগ্ধ রাজত্ব। মাথার ওপরে শরতের নীল আকাশে ভাসমান সাদা মেঘের ভেলা, আর নিচে নদীর তীরে বিস্তীর্ণ শুভ্র কাশবন- সব মিলিয়ে এক নৈসর্গিক চিত্রপট। ঠিক এমন মোহনীয় ও কাব্যিক পরিবেশে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে, সোমেশ্বরী নদীর চরে উদ্যাপিত হলো দিনব্যাপী ‘শরৎ উৎসব ১৪৩৩’।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে শহীদ সন্তোষ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগে মুখরিত হয়ে ওঠে নদীর তীরবর্তী কাশবাগান। কথা, কবিতা আর গানে গানে সাজানো এ আয়োজন যেন হয়ে উঠেছিল প্রকৃতি ও মানুষের অপূর্ব মিলনমেলা।
নদীর তীরের কাশবাগানে খোলা আকাশের নিচে টানানো হয়েছিল নান্দনিক সামিয়ানা, যার নিচে সারি সারি লাল চেয়ারে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন দর্শনার্থী ও অতিথিরা। সামিয়ানার নিচে বিছানো সবুজ গালিচায় বসে হারমোনিয়াম ও তবলার সুরে সুর মিলিয়েছেন শিল্পীরা। পাশেই শোভা পাচ্ছিল ‘কথা-কবিতা-গানে শরৎ উৎসব ১৪৩৩’ লেখা একটি দৃষ্টিনন্দন ব্যানার।
শিশুদের মনোমুগ্ধকর নৃত্যের মধ্য দিয়ে উৎসবের পর্দা ওঠে। এরপর আসর মাতান জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘সবুজ সুরের সন্ধানে’ সিজন-১-এর শীর্ষ দশে থাকা প্রতিভাবান কণ্ঠশিল্পী মিজানুর রহমান কাঞ্চন ও তার দল। সবুজ গালিচায় বসে তাদের পরিবেশিত লোকজ ও শরতের গান উপস্থিত দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
আয়োজনের বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও শেকড়ের সন্ধান নিয়ে গভীর আলোচনা। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দেশের সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও মননশীল বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট কবি এনামূল হক পলাশ।
কবি পলাশ তার বক্তব্যে বলেন, “জনগণের সংস্কৃতি ছাড়া অন্য কোনো সংস্কৃতি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সকল সংস্কৃতিই মূলত একটি স্বতঃস্ফূর্ত ক্রিয়া।”
রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংস্কৃতির ‘কাল্ট’ বা অন্ধ অনুকরণীয় দেবতা বানানো যাবে না ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের মাটি ও সংস্কৃতি থেকে তাকে আলাদা করারও কোনো সুযোগ নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গঠনমূলক সমালোচনা করা যাবে না- এমন কোনো কথা নেই। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, বৌদ্ধ সহজিয়া সাধু, সুফি দরবেশ, শ্রী চৈতন্য, লালন সাঁই, রবীন্দ্রনাথ কিংবা কাজী নজরুল ইসলাম- আমাদের সাংস্কৃতিক পূর্ণতার স্বার্থে কাউকেই বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই “
শহীদ সন্তোষ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সভাপতি পলাশ সাহার সভাপতিত্বে এবং কবি বিদ্যুৎ সরকারের সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ শহীদ খান। এছাড়াও শরতের এই স্নিগ্ধ বিকেলে কবিতা আবৃত্তি ও আলোচনায় অংশ নেন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা একঝাঁক গুণী কবি ও সাহিত্যিক। তাদের মধ্যে কবি লোকান্ত শাওন, কবি অনিন্দ্য জসিম, কবি বকুল মাস্টার, কবি দুনিয়া মামুন এবং কবি সজীম সাইম ছিলেন অন্যতম।
আয়োজকরা জানান, সোমেশ্বরী নদীর চরে এটি তাদের দ্বিতীয় আয়োজন। প্রকৃতির এত কাছাকাছি বসে এমন পরিপাটি ও গোছানো অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পেরে আমন্ত্রিত অতিথি, শিল্পী ও সাধারণ দর্শনার্থীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। নদীর মৃদু হাওয়া, কাশফুলের দোলা এবং শিল্পীদের সুরেলা কণ্ঠ- সব মিলিয়ে দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর চর শুক্রবার বিকেলে হয়ে উঠেছিল এক টুকরো সাংস্কৃতিক স্বর্গভূমি। সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই উৎসব প্রমাণ করেছে, শেকড়ের সংস্কৃতির প্রতি বাঙালির টান আজও অমলিন।




