নিজস্ব প্রতিবেদক: সবুজ প্রকৃতি আর পাহাড়ি জনপদের মেলবন্ধনে ঘেরা নেত্রকোনার দুর্গাপুর। প্রান্তিক এই জনপদের মানুষের প্রাত্যহিক জীবন ও কৃষির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে এখানকার ছোট-বড় খাল আর জলাশয়গুলো। এই প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের ওপর যখন ব্যক্তি স্বার্থের থাবা পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কা জাগে জনমনে। ঠিক এমনই উদ্বেগের জন্ম হয়েছিল উপজেলার সীমান্তঘেঁষা বারমারী লক্ষীপুর গ্রামে। তবে সচেতন গ্রামবাসী আর প্রশাসনের ত্বরিত ও সমন্বিত পদক্ষেপে রক্ষা পেলো গ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ খালের প্রাণ।
শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেলের ঘটনা। উপজেলার দুই নম্বর দুর্গাপুর ইউনিয়নের বারমারী লক্ষীপুর গ্রামে খালের বুক চিরে ইটের পর ইট গেঁথে ক্রমশ মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল পাকা দেয়াল। স্থানীয় রাজিব রায় নামের ব্যক্তির বিরুদ্ধে খালের প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ফুট জায়গা দখল করে দেয়াল নির্মাণের অভিযোগ ওঠে। চোখের সামনে প্রবহমান খালের এমন দমবন্ধ করা অবস্থা মেনে নিতে পারেননি স্থানীয়রা। প্রকৃতির ক্ষতি রোধে তারা দ্রুত বিষয়টি জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে অবহিত করেন।
জনমানুষের আকুলতায় তাৎক্ষণিক সাড়া দেন ডেপুটি স্পিকার। প্রাকৃতিক ভারসাম্য, পানিপ্রবাহ ও জনস্বার্থ রক্ষায় তিনি কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনকে। নির্দেশ পেয়ে বিকেল ৫টার দিকেই অকুস্থলে ছুটে যান দুর্গাপুরের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মিজানুর রহমান।
প্রশাসনের উপস্থিতিতে মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায় অবৈধ দখল ও নির্মাণের কাজ। শুধু নির্মাণকাজ বন্ধই নয়, খালের স্বাভাবিক শ্বাস ফেরাতে আগামী তিন দিনের মধ্যে ওই জমিতে নির্মিত পাকা দেয়াল সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রশাসনের এমন বলিষ্ঠ অভিযানের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি তোবারক হোসেন খোকন, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হারেজ উদ্দিন এবং হাজং সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দোলন হাজং-সহ এলাকার বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি।
প্রশাসনের এমন ত্বরিত পদক্ষেপে স্বস্তি ফিরেছে বারমারী লক্ষীপুর গ্রামে। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে স্থানীয়রা বলেন, একটি খাল কেবল জলাশয় নয়, এটি এই এলাকার প্রাণভোমরা। এভাবে খালের জায়গা দখল হতে থাকলে একসময় খালটি সংকুচিত হয়ে পানিপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেত। এর ফলে জনস্বার্থ ও পরিবেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
শুধু দেয়াল অপসারণই নয়, এলাকাবাসীর কণ্ঠে উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কিছু শঙ্কার কথাও। তারা জোর দাবি জানান, ভবিষ্যতে যেন কেউ কোনোভাবেই খালের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করতে না পারে। একই সঙ্গে, এলাকার খাল থেকে যেন কেউ অবৈধভাবে বালু ও পাথর তুলতে না পারে, সে জন্য প্রশাসনের স্থায়ী ও কঠোর নজরদারি প্রত্যাশা করেন সর্বস্তরের মানুষ।
জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মিজানুর রহমান উপস্থিত জনতাকে আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, “জনস্বার্থ বাস্তবায়নে খালের জায়গা যেকোনো মূল্যে সুরক্ষিত রাখা হবে। খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বজায় রাখতে কার্যকর সকল পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
পাশাপাশি অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, “খাল থেকে কেউ যাতে অবৈধভাবে বালু ও পাথর তুলতে না পারে, সে জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে।” অভিযুক্ত ইমারতের মালিক রাজিব রায়ের বিষয়ে প্রশাসন জানায়, তাকে জমির যাবতীয় বৈধ কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
একটি খালের স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা কেবল পরিবেশের জয় নয়, এটি একটি জনপদের জীবনযাত্রা সুরক্ষিত রাখারও অংশ। দুর্গাপুরের এই ঘটনা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল- নাগরিক সচেতনতা আর প্রশাসনের সদিচ্ছার সঠিক সমন্বয় ঘটলে যেকোনো অন্যায় আগ্রাসন রুখে দেওয়া সম্ভব। আপাতত বারমারী লক্ষীপুরের খালটি তার নিজের ছন্দে বয়ে চলার অপেক্ষায়।




