নিজস্ব প্রতিবেদক: বুধবারের সকালটা নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার নছিবপুর গ্রামের মানুষের জন্য কিছুটা উদ্বেগের হলেও, দিনশেষে সেখানে ফিরেছে স্বস্তি। একটি জমির মালিকানা এবং পাশের খানকা শরীফের (মাজার) গান-বাজনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছিল মসজিদের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনায়। এতে বুধবার ভোরে ফজরের নামাজ আদায় করতে এসে বিপাকে পড়েন মুসল্লিরা। তবে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপে বড় ধরনের কোনো সংঘাত ছাড়াই সংকটের অবসান ঘটেছে।
এলাকাবাসী ও মসজিদ কমিটি সূত্রে জানা যায়, ঘটনার শেকড় লুকিয়ে আছে নছিবপুর দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ ওয়াক্ফকৃত জমি ঘিরে। এই জমির মালিকানা নিয়ে মসজিদ কমিটির সঙ্গে স্থানীয় রেজাউল করিম রামিম, উছমান মিয়া ও ইদ্রিছ আলীর বেশ কিছুদিন ধরেই বিরোধ চলে আসছিল। অভিযোগ রয়েছে, বিআরএস (রেকর্ড অব সার্ভে) জরিপে ভুলবশত ওই জমিটি রেকর্ডভুক্ত হয়নি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিবাদী পক্ষ জমিটি দখলের চেষ্টা করছে বলে দাবি মসজিদ কমিটির। জমির এই আইনি লড়াইটি বর্তমানে আদালতেও চলমান।
জমির বিরোধের পাশাপাশি সম্পর্কে আরও তিক্ততা বাড়ায় মসজিদের পাশেই গড়ে ওঠা একটি মাজার। ইদ্রিছ আলী নামের এক ব্যক্তি সেখানে ‘খানকায়ে রহমানিয়া সৈয়দ গোলাম মরতুজা মাইজভান্ডারীয়া ইদ্রিছ আলী মাইজভান্ডারি খানকা শরীফ’ প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদ কমিটির অভিযোগ, সেখানে প্রতিদিন এশার নামাজের পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দে গান-বাজনা চলত এবং লোকজনের ব্যাপক আনাগোনা ছিল। এতে মসজিদের ইবাদতের পরিবেশ ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আপত্তি জানায় মসজিদ কমিটি।
গান-বাজনায় আপত্তি জানানোর জের ধরেই গতকাল (মঙ্গলবার) রাতে এশার নামাজের পর কে বা কারা নছিবপুর দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। বুধবার ভোরে ফজরের আজান শেষে মুসল্লিরা নামাজ পড়তে এসে দেখেন মসজিদে ঢোকার উপায় নেই। এ খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মুসল্লিদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সকালে মাওলানা ওয়াসেফ বিল্লাহ নোমানীর নেতৃত্বে শতাধিক লোক মসজিদের সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে পাশের মাজারটি ভেঙে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার খবর পেয়ে কালক্ষেপণ না করে ঘটনাস্থলে ছুটে যান পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শফিকুল ইসলাম। তার সঙ্গে যোগ দেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ছিদ্দিকুর রহমান বুলবুল এবং পূর্বধলা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল।
উপস্থিত মুসল্লি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে সবার উপস্থিতিতেই মসজিদের তালা খুলে দেয় প্রশাসন। এ সময় সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার স্বার্থে খানকা শরীফে আর কোনো ধরনের গান-বাজনা করা যাবে না বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়। মাজার কর্তৃপক্ষও প্রশাসনের সিদ্ধান্ত মাথা পেতে মেনে নেয়।
তবে মসজিদের গেটে তালা দেওয়ার অভিযোগটি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন খানকা শরীফের প্রতিষ্ঠাতা ইদ্রিছ আলী। তিনি দাবি করেন, এ ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই; বরং তাকে ফাঁসাতেই একটি মহল ষড়যন্ত্র করেছে।
পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শফিকুল ইসলাম বলেন, “মসজিদের গেটে তালা লাগানোর খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মুসল্লিদের উপস্থিতিতেই তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। মাজার কর্তৃপক্ষকে গান-বাজনা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তারাও সেটি মেনে নিয়েছে। তবে কে বা কারা মসজিদে তালা লাগিয়েছে, সেটি তদন্ত করে বের করার জন্য পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
এদিকে পূর্বধলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, এ ঘটনায় মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশ বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদন্ত করছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রশাসনের এমন আন্তরিক ও দ্রুত পদক্ষেপে নছিবপুর গ্রামে বর্তমানে থমথমে ভাব কেটে গেছে এবং এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে। এলাকার সাধারণ মানুষও আশা করছেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাকি বিরোধগুলোর সুষ্ঠু সমাধান হবে।




