বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০

নিজস্ব প্রতিবেদক: যে করাত কলে সারাদিন কাঠ কাটার তীক্ষ্ণ শব্দ আর শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকত চারপাশ, সেখানে এখন কেবলই পোড়া গন্ধ আর নীরবতা। একটি রাতের আগুন শুধু কাঠ বা যন্ত্রপাতিই পোড়ায়নি, পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শতাধিক নিম্নআয়ের মানুষের স্বপ্ন ও অন্নসংস্থানের পথ। নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার ঘাগড়া বাজারে দীর্ঘদিনের পুরোনো ‘বিসমিল্লাহ করাত কলে’ দেওয়া রহস্যজনক আগুনের ঘটনায় এবার ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয়রা।

শত্রুতার জেরে পেট্রোল ঢেলে অগ্নিকাণ্ড ঘটানো হয়েছে- এমন অভিযোগ তুলে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ভষ্মীভূত সেই মিলের সামনেই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত মালিক, কর্মহীন শ্রমিক, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা।

গত শনিবার দিবাগত রাত তখন প্রায় দেড়টা। ঘাগড়া বাজারের নৈশপ্রহরী মঈন উদ্দিনের আকস্মিক ফোন কলেই বদলে যায় মিল মালিক শফিক মিয়া ওরফে শফিক বেপারীর পৃথিবী। ছুটে গিয়ে তিনি দেখেন, তার তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানটি দাউ দাউ করে জ্বলছে। স্থানীয়দের সহায়তায় আপ্রাণ চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে।

আগুনে মিলের মূল ঘর, একটি সেলো মেশিন, করাত, বেল্ট, শান পাথর থেকে শুরু করে মজুত রাখা মূল্যবান কাঠ- সবই চোখের সামনে কয়লা হয়ে যায়। এতে মূল মেশিনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি মালিকপক্ষের।

এটি নিছক কোনো বৈদ্যুতিক শর্ট-সার্কিট বা দুর্ঘটনা নয় বলে দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের। মিল মালিকের ছেলে শামীম মিয়া জানান, আগুন নেভানোর পর ঘটনাস্থলের কিছুটা দূরে একটি ১০ লিটার ধারণক্ষমতার প্লাস্টিকের ট্যাংকি পড়ে থাকতে দেখা যায়, যেটিতে তখনও কিছু পেট্রোল অবশিষ্ট ছিল। তাদের বদ্ধমূল ধারণা, পূর্বশত্রুতার জেরে কেউ রাতের আঁধারে পরিকল্পিতভাবে পেট্রোল ঢেলে এমন অমানবিক অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়েছে।

পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল থেকে সেই পেট্রোলের ট্যাংকি ও অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করেছে। শামীম মিয়া ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‍“যারা এমন ন্যক্কারজনক কাজ করেছে, তারা শুধু আমাদের আর্থিকভাবেই পঙ্গু করেনি, অনেকগুলো গরিব মানুষের পেটে লাথি মেরেছে। আমরা তাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।”

মঙ্গলবার বেলা ১২টায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে উপস্থিত মানুষের চোখে-মুখে ছিল অনিশ্চয়তা আর ক্ষোভ। মানববন্ধনে কান্নায় ভেঙে পড়েন মিলের ভ্যানচালক ইলিয়াস আলী। প্রতিষ্ঠানটির জন্মলগ্ন থেকেই তিনি এখানে কাজ করছেন। তিনি বলেন, “এই মিলটিই ছিল আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। আগুন তো শুধু মিল পোড়ায়নি, আমাদের মতো অনেক শ্রমিকের ভাত কেড়ে নিয়েছে। আমরা এখন কোথায় যাব?”

ঘাগড়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মোতালিব সমাজের ক্ষতির দিকটিই তুলে ধরেন তার বক্তব্যে। তিনি বলেন, “একটি প্রতিষ্ঠান যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন শুধু এর মালিক নিঃস্ব হন না। এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক, কাঠ ব্যবসায়ী এবং পরিবহন কর্মীরাও পথে বসেন। জঘন্য এই অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন কাজ করার সাহস না পায়।”

একই সুর শোনা যায় ঘাগড়া বাজার বণিক সমিতির সভাপতি শামছুল হক আকন্দ হীরা এবং বাজার ইজারাদার আবু হানিফ মিয়ার কণ্ঠে। তারা জানান, করাত কলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘাগড়া বাজারের অনেক দরিদ্র মানুষ রাতারাতি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অবিলম্বে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জোর দাবি জানান তারা।

পুরো ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এ বিষয়ে পূর্বধলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি দল এবং তিনি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

ওসি বলেন, “আমরা ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাটির পেছনের কারণ এবং জড়িতদের শনাক্তে আমাদের নিবিড় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।”

একদিকে ১০ লাখ টাকার বিপুল আর্থিক ক্ষতি, অন্যদিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দিন পার করছেন করাত কলটির সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলো। এখন তাদের একটাই প্রত্যাশা- প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে প্রকৃত অপরাধীরা যেন ধরা পড়ে এবং জীবনের পোড়া স্তূপ থেকে তারা যেন আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version