মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩

শাহ আলী তৌফিক: জীবনের পড়ন্ত বিকেল। বয়সের ভারে শরীর কিছুটা ক্লান্ত হলেও মনের জোর এতটুকু কমেনি। সংসারের নিত্য টানাপোড়েন আর অভাবের মাঝেও তার কলম থেমে নেই। সুযোগ পেলেই কাগজ-কলম নিয়ে বসেন, মনের ভেতর জমে থাকা কথাগুলোকে নিপুণভাবে শব্দের মালায় গাঁথেন। কখনো আনমনে সুর তোলেন, কখনোবা নিজেই গেয়ে শোনান নিজের লেখা গান। তিনি নেত্রকোনার কেন্দুয়ার প্রবীণ বাউল কবি সালাম সরকার। তিন দশকের বেশি সময় ধরে গানকে ভালোবেসে সৃষ্টি করেছেন দুই হাজারেরও বেশি গান। দীর্ঘ এই সংগীত সাধনায় মানুষের বিপুল ভালোবাসা পেলেও জোটেনি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

১৯৬৭ সালের ৪ আগস্ট নেত্রকোনার মদন উপজেলার জয়পাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সালাম সরকার। জন্মভূমি মদন হলেও তার জীবনের এক বিশাল অংশ কেটেছে কেন্দুয়ায়। কেন্দুয়া পৌরশহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার নিজ বাড়িতেই গড়েছেন সংসার। স্ত্রী, সন্তান আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে তার বর্তমান জীবন। সময়ের পরিক্রমায় চারপাশ বদলেছে, শরীরে বার্ধক্য এসেছে, কিন্তু গানের প্রতি তার আত্মার যে টান, তা আজও অটুট।

তিন দশকের দীর্ঘ সংগীত যাত্রায় সালাম সরকারের কলম থেকে বেরিয়েছে দুই হাজারেরও বেশি লোকগান। তার লেখা এসব গান দেশের বিভিন্ন খ্যাতিমান ও নবীন শিল্পীদের কণ্ঠে প্রাণ পেয়েছে। বাউল সালামের গানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সরলতা। গ্রামীণ মানুষের জীবন, প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখ, মানবিক সম্পর্ক আর লোকজ জীবনের চেনা ছবিগুলো অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় তার গানে উঠে এসেছে। মানুষের মুখের ভাষা আর পরিচিত অনুভূতিগুলো গানের কথায় স্থান পাওয়ায়, তা কেবল মঞ্চ বা শিল্পীর কণ্ঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

জনপ্রিয়তার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অসংখ্য শ্রোতার হৃদয় জয় করলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দরজা এই গুণী শিল্পীর জন্য আজও খোলেনি। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার কিংবা স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননাই তার ভাগ্যে জোটেনি। এ নিয়ে প্রবীণ এই বাউলের অসংখ্য ভক্ত ও অনুরাগীদের মনে গভীর আক্ষেপ রয়েছে।

এলাকাবাসীর জোর দাবি, বাংলা লোকসংগীতে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাউল সালাম সরকারের যে অসামান্য অবদান, তার যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। জীবনের শেষ বেলায় এসে সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করবে- এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

যার সৃষ্টিতে এত মানুষের মুগ্ধতা, সেই সালাম সরকার অবশ্য কখনো পুরস্কারের হিসাব কষে গান করেননি। জীবনের বর্তমান বাস্তবতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, শেষ বয়সে এসে স্ত্রী, সন্তান ও নাতিদের নিয়ে অভাব-অনটনের মাঝে অনেকটা কষ্ট করেই তার সংসার চলছে। তবুও এই নিদারুণ কষ্টের মাঝেও গানই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

কথার ফাঁকে পুরোনো আত্মবিশ্বাস নিয়ে এই বাউল কবি বলেন, ‘জীবনে ভক্তদের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তার জন্যই হয়তো এখনো বেঁচে আছি। এখনো গান লিখছি এবং গাইছি। নতুন নতুন আরও গান উপহার দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়ে তার কণ্ঠে কোনো আক্ষেপ বা অভিযোগ নেই, বরং আছে এক নীরব অপেক্ষা। তিনি বলেন, ‘পুরস্কার বা সম্মাননার আশায় গান করিনি। গান আমার জীবন। জীবনের তাগিদেই গান করি। তবে সরকার যদি আমাকে যোগ্য মনে করে, তাহলে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেবে- আমি সেই অপেক্ষাতেই আছি।’

একসময় যে কণ্ঠে প্রতিনিয়ত নতুন গানের জন্ম হতো, সেই কণ্ঠে আজ বয়সের সুস্পষ্ট ছাপ। জীবনের বাস্তবতাও অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৃষ্টির জায়গায় এই বাউল এখনো হার মানেননি। একজন প্রকৃত শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয় বোধহয় এটাই- সময় হয়তো তার শরীরকে দুর্বল করে দিতে পারে, কিন্তু তার সৃষ্টিকে থামিয়ে দিতে পারে না। দুই হাজারের বেশি গান লেখার পরও, নতুন গানের জন্য তার ভেতরে এখনো শব্দেরা ভিড় করে।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কবে আসবে বা আদৌ আসবে কি না, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। শ্রোতাদের অফুরন্ত ভালোবাসায় সিক্ত বাউল সালাম সরকার তার জীর্ণ ঘরে বসেই আজও গান লিখছেন। তার গান থামেনি, শুধু বদলে গেছে জীবনের সুর।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version