নিজস্ব প্রতিবেদক: শিক্ষার্থীদের বহুমুখী ও সুষম বিকাশের লক্ষ্যে নেত্রকোনায় ‘একটি প্রতিষ্ঠান, চারটি ক্লাব’ মডেলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় নেত্রকোনা পৌর শহরের ঐতিহ্যবাহী এন. আকন্দ কামিল মাদ্রাসায় নবগঠিত ভাষা ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব ও সাংস্কৃতিক ক্লাবের শুভ উদ্বোধন করা হয়। একই সাথে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পালিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান। মাদ্রাসার অধ্যক্ষের সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা। এছাড়া সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মনিজা খাতুন, জেলা শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর কবীর আহাম্মদ, মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, এলাকার সুধীজন ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ক্লাবগুলোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পাশাপাশি প্রধান অতিথি খন্দকার মুশফিকুর রহমান মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আয়োজিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিরও উদ্বোধন করেন এবং নিজ হাতে গাছের চারা রোপণ করে পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা দেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “শিক্ষা কোনো একপাক্ষিক উন্নয়ন নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। শিক্ষার্থীদের কেবল পুঁথিগত বা টেক্সটবুক নির্ভর শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য সহশিক্ষা কার্যক্রম অপরিহার্য।” শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্যই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিকভাবে চারটি ক্লাবের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
সমাজে ভালো কাজের প্রসারে ক্লাবগুলোর ভূমিকা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, “অসহায় মানুষকে সহায়তা করা এবং সমাজকে সুসংগঠিত করতে ‘হিলফুল ফুজুল’-এর মতো সামাজিক উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী মূল্যবোধ বজায় রেখেও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা করে মানসিক বিকাশ ঘটানো সম্ভব।” বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের যুগে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের কথা উল্লেখ করে তিনি শিক্ষার্থীদের আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার আহ্বান জানান। উপমহাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষার ঐতিহাসিক অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, “১৯৪৭ সালের পূর্ববর্তী সময়ে অনেক বড় বড় নেতৃত্ব মাদ্রাসা থেকে উঠে এসেছেন। তখন মাদ্রাসা শিক্ষাই ছিল প্রাথমিক শিক্ষার মূল ভিত্তি।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মুন মুন জাহান লিজা বলেন, “সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের নিজের জীবন গঠন, সমাজ ও দেশকে দেওয়ার অপার সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠগুলোতে আজ মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা মেধার স্বাক্ষর রাখছেন, যা নতুন প্রজন্মের জন্য দারুণ অনুপ্রেরণাদায়ক।”
ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “পড়াশোনার শুরুতে আমরা দোয়া পড়ি- ‘রব্বি যিদনি ইলমা’। ইসলামের প্রথম বাণীই হলো ‘ইকরা’ বা পড়ো। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জনের তাগিদ ইসলাম আমাদের দিয়েছে। নৈতিক শিক্ষার আলো পেয়ে বড় হওয়া মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা নিষ্ঠার সাথে কাজ করলে কেবল নেত্রকোনা নয়, বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশের সুনাম ছড়িয়ে দেবে।”
এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের বিতর্ক ও সুন্দর বক্তৃতার বিভিন্ন কৌশল শিখিয়ে দেন। বিতর্ক ও বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করে তিনি মডারেটরের সাথে সংযোগ রাখা, আই-কনট্যাক্ট বজায় রাখা এবং ছোট চিরকুটে পয়েন্ট লিখে যুক্তি তুলে ধরার অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার নিয়ে শিক্ষার্থীদের আয়োজিত যুক্তিপূর্ণ বিতর্কের প্রশংসা করে তিনি নিয়মিত বিজ্ঞান ও বিতর্ক চর্চা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা হামদ-নাত, নজরুল সংগীত, কবিতা আবৃত্তি, ত্রিভাষিক বক্তব্য (বাংলা, ইংরেজি ও আরবি), বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং বিজ্ঞান ক্লাবের উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শন করে।
সভাপতির সমাপনী বক্তব্য ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম ও পরিবেশ রক্ষায় এমন উদ্যোগে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।



