শনিবার, অক্টোবর ২৪

বর্ষার জলে বিল-ঝিল, খাল কিংবা ডুবে থাকা কৃষি জমিতে ফুটে থাকা শাপলাই এখন বরিশালের আগৈলঝাড়ার বহু পরিবারের জীবিকার অবলম্বন। বর্ষায় কৃষি জমি পানির নিচে তলিয়ে থাকায় যখন কৃষকের হাতে কাজ কমে যায়, তখন বিনা পুঁজিতে বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে বিক্রি করেই সংসারের খরচ মেটাচ্ছেন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কয়েকশ’ মানুষ।

ভোরের আলো ফুটতেই নৌকা নিয়ে বিলের পানিতে নামেন শাপলা সংগ্রহকারীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে ঘুরে শাপলা সংগ্রহের পর তা নিয়ে আসেন স্থানীয় পাইকারদের কাছে।

পাইকাররা সেসব শাপলা কিনে ভ্যানযোগে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার এবং আশপাশের উপজেলার গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিক্রি করেন। কেউ আবার সরাসরি বাজারে নিয়ে বসেন।

আগৈলঝাড়ার চেংগুটিয়া-চৌদ্দমেদা বিলসহ বিভিন্ন বিল ও জলাবদ্ধ কৃষি জমিতে এখন শাপলা সংগ্রহের ব্যস্ততা। উপজেলার রাজিহার, গৈলা, বাকাল, বাগধা ও রতপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এই মৌসুমি পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

চেংগুটিয়া-চৌদ্দমেদা বিল থেকে শাপলা সংগ্রহকারী মো. কালাম হাওলাদার বাসস’কে বলেন, বর্ষায় কৃষি জমি পানির নীচে থাকে। তখন কৃষি কাজ তেমন থাকে না। তাই ভোরে নৌকা নিয়ে বিলে যাই। দিনে ২শ’ থেকে ৪শ’ মুঠা পর্যন্ত শাপলা সংগ্রহ করতে পারি।

স্থানীয় শাপলা সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে পাইকাররা মুঠা প্রতি প্রায় ৫ টাকা দরে শাপলা কিনে নেন। পরে সেগুলো ভ্যানযোগে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে খুচরা বিক্রি করেন। এতে পাইকারদেরও তৈরি হয়েছে মৌসুমি আয়ের সুযোগ।

পাইকার বনজ মন্ডল বাসস’কে বলেন, সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে এক মুঠা শাপলা ৫ টাকা দরে কিনি। পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১০ টাকা করে বিক্রি করি। প্রতিদিন প্রায় ২শ’ থেকে ৩শ’ মুঠা বিক্রি হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে ভালোই আয় হয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষার মৌসুমে একেকজন সংগ্রহকারী প্রতিদিন প্রায় ২শ’ থেকে ২৫০ মুঠা শাপলা সংগ্রহ করতে পারেন। ভালো দিনে কারও কারও আয় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫শ’ টাকা পর্যন্ত হয়। আর পাইকারি কেনাবেচায় যুক্তদের দৈনিক বিক্রি দাঁড়ায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বা তারও বেশি।

শাপলা সংগ্রহকারী রহমান জানান, বছরের প্রায় ৪ মাস তিনি এই কাজ করেন। তাঁর ভাষায় এই সময় জমিতে কাজ থাকে না। শাপলা তুলে বিক্রি করে যে টাকা পাই, তা দিয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ চালাই। কোনো পুঁজি লাগে না। তাই বর্ষায় এটি আমাদের জন্য বড় ভরসা। স্থানীয়ভাবে শাপলা মূলত সবজি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। শাপলার ডাঁটা দিয়ে তৈরি তরকারি গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘদিনের পরিচিত খাবার হলেও সাম্প্রতিক সময়ে শহরাঞ্চলেও এর চাহিদা বাড়ছে।

ফলে বর্ষাকালে বিল ও ডোবা থেকে বিনা খরচে পাওয়া শাপলা এখন স্থানীয় বাজারে পরিণত হয়েছে অর্থকরী পণ্যে।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, আষাঢ় থেকে ভাদ্র এই তিন-চার মাস শাপলার মৌসুম। বর্ষার পানিতে ডুবে থাকা ধান, পাট ও ধঞ্চে জমিতে যেমন শাপলা জন্মে, তেমনি খাল-বিল, পুকুর ও ডোবাতেও এর বিস্তার ঘটে।

প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়ায় শাপলা উৎপাদনে কৃষকের আলাদা কোনো বিনিয়োগ করতে হয় না।

আগৈলঝাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুনীতি কুমার সাহা বাসস’কে বলেন, শাপলা প্রচলিত কৃষিপণ্যের আওতাভুক্ত নয়। এটি মূলত প্রাকৃতিকভাবে কৃষি জমি, পুকুর, ডোবা ও জলাশয়ে জন্মে।

ফলে এ বিষয়ে কৃষি বিভাগের সরাসরি পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ সীমিত। তবে কৃষকদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হয়। শাপলা যাতে কিছুটা বেশি সময় সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়েও পরামর্শ দেয়া হয়।

বরিশাল বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) মো. শহিদুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, যথাযথ সংরক্ষণ ও বিদেশে রপ্তানি করা গেলে শাপলা থেকেই প্রতিবছর আয় হতে পারে কয়েক কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।

তিনি আরও বলেন, শাপলা সংগ্রহে কোনো পুঁজির প্রয়োজন না হওয়ায় বিভিন্ন বয়সের কৃষকরা বর্ষা মৌসুমকে ঘিরে এ পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। এছাড়াও প্রতি ১শ’ গ্রাম শাপলা লতায় আছে ৩১ গ্রাম শর্করা তিন গ্রাম প্রোটিন ও ৭৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম। যা মানবদেহের জন্য খুবই উপকারী একটি সবজি।

আগৈলঝাড়ার বিলাঞ্চলের মানুষের কাছে বর্ষা এক সময় ছিল কর্মহীনতার মৌসুম। পানিতে তলিয়ে যেত কৃষি জমি, কমে যেত মাঠের কাজ। সেই পানিই এখন অনেক পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে আয়ের উৎস। শাপলা সংগ্রহ থেকে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি মৌসুমি এই কর্মকাণ্ডকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ছোট্ট একটি অর্থনৈতিক বলয়।

একদিকে বিল থেকে শাপলা তুলে আয় করছেন সংগ্রহকারীরা, অন্যদিকে পাইকার ও ভ্যানচালকরাও যুক্ত হচ্ছেন এর বিপণনে। আর ক্রমবর্ধমান চাহিদা এই প্রাকৃতিক সম্পদকে স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে। জাতীয় ফুল শাপলা তাই, আগৈলঝাড়ার মানুষের কাছে শুধু বর্ষার সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; বরং বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বহু পরিবারের সংসার চালানোর নীরব অবলম্বন।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version