নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনা কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নে পুরানো গোরস্থানের আধিপত্য বিস্তার ও সেখানে দোকান নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামবাসীর মধ্যে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চলা উভয় পক্ষের তাণ্ডবে অন্তত ১২০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ও দোকানপাটে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় ও পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, রংছাতি ইউনিয়নের আমগড়া এবং পুলিয়া ও পানেশ্বর পাড়ার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ১৮ কাঠা (১৪৪ শতাংশ) আয়তনের পুরানো গোরস্থানের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। আমগড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা গোরস্থানের রাস্তার পাশের অংশে ছোট দোকানপাট নির্মাণ করে বাজার বসানোর উদ্যোগ নিলে পানেশ্বর পাড়ার লোকজন তাতে তীব্র বাধা দেয়। পানেশ্বর পাড়ার দাবি, এটি ওয়াকফকৃত সম্পত্তি এবং এটি কেবল কবরস্থান হিসেবেই ব্যবহৃত হবে।

এ বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সম্প্রতি ১৫ দিন আগে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে শালিস দরবার অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আজ (শুক্রবার) সকালে গোরস্থানে ব্যানার ঝোলানোকে কেন্দ্র করে পুনরায় উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুক্রবার সকালে আমগড়া ও নল্লাপাড়া গ্রামের শত শত মানুষ দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পুলিয়া ও পানেশ্বর পাড়া গ্রামে অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি বাড়িঘর ও দোকানপাটে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। তাদের তাণ্ডব থেকে বিয়ের বাড়ির গেইট এবং গরুর খামারও রক্ষা পায়নি। পানেশ্বর পাড়ার বাসিন্দাদের দাবি, হামলার সময় হামলাকারীরা কমপক্ষে ২০ লক্ষ টাকার মালামাল লুটপাট করেছে।
এ ঘটনায় দুপক্ষের অন্তত ১২০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এরমধ্যে, কেবল আমগড়া, নল্লাপাড়া ও হাসনাগাঁও গ্রামেরই ৫৪ জন আহত হয়েছেন। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে কলমাকান্দা সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে গুরুতর আহত ছয় জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাকি আহতরা কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন এবং অনেকে আবার স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন।
পানেশ্বর পাড়ার বাসিন্দা আব্দুল ওয়াহাব ও হোসেন মিয়া বলেন, “গোরস্থানটি ৮০-৯০ বছর ধরে আমাদের বাপ-দাদারা হেফাজত করে আসছেন। সম্প্রতি আমরা সাড়ে তিন লক্ষ টাকার মাটি কাটিয়েছি এবং স্থানীয় এমপি সাহেব দেয়াল ও পিলারের জন্য এক লক্ষ ১৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। আমগড়ার লোকজন জোরপূর্বক সেখানে দোকান করতে চায়। আজ সকালে জুই, জনি, হোসেন মিয়া, হযরত, টিটু, মওলা, মোশাররফ ও কামাল পাশার নেতৃত্বে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়।” তারা আরও দাবি করেন, গোরস্থানের সঠিক দলিল তাদের নামেই রয়েছে এবং প্রশাসনের কাছে তারা দলিলের ভিত্তিতে এর সুষ্ঠু সমাধান চান।
রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, “মাননীয় ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের নির্দেশে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ওই গোরস্থানের সার্বিক তত্ত্বাবধান ইউনিয়ন পরিষদ করবে। উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” তিনি সংঘর্ষের পর ব্যাপক ভাঙচুরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এলাকা বর্তমানে থমথমে থাকলেও পুরোপুরি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের কাছ থেকেই লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”