রবিবার, অক্টোবর ৪

রুহুল আমিন, ডিমলা(নীলফামারী)

তিস্তার ভাঙন ঠেকাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নদীতীরে প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বসানো হয়েছে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব। অথচ সেই প্রতিরক্ষা বাঁধের কাছেই নদীর তলদেশ থেকে চলছে বালু উত্তোলন। সিক্স সিলিন্ডার বোমা মেশিন বসিয়ে দিন-রাত চলছে এ কার্যক্রম। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক মাস ধরে একটি চক্র এভাবে বালু তুলে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছে।

 

ঘটনাটি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানী ইউনিয়নের ছোটখাতা কলম্বিয়া গাইড বাঁধের ‘টি’ বাঁধসংলগ্ন তিস্তা নদীর। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নদীর তলদেশ থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে সেখানে গভীরতা সৃষ্টি হয়ে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে। এতে নদীতীরের ভাঙন আরও তীব্র হয়ে আবাদি জমি, বসতভিটা ও বাঁধের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে।

 

গত শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, ছোটখাতা কলম্বিয়া গাইড বাঁধের ‘টি’ বাঁধের প্রায় ২০০ ফুট পশ্চিমে বটতলী এলাকায় তিস্তা নদীতে একটি সিক্স সিলিন্ডার বোমা মেশিন বসানো হয়েছে। মেশিনের সঙ্গে পাইপ সংযোগ দিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, দিনে বালু উত্তোলনের পাশাপাশি রাতেও মেশিন চালানো হয়।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, বসতভিটা উঁচু করার কথা বলে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হলেও পরে এসব বালু বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম ভাকু ও তাঁর লোকজন রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে প্রভাব খাটিয়ে বালু উত্তোলন করছেন।

 

তিস্তার ভাঙনে ছোটখাতা গ্রামের অনেক কৃষক ইতোমধ্যে আবাদি জমি হারিয়েছেন। চলতি বন্যায় কৃষক রহিজ উদ্দিনের প্রায় ২৫ শতাংশ জমি নদীগর্ভে চলে গেছে।

 

রহিজ উদ্দিন বলেন, ‘এখন ৫০ শতাংশ আবাদি জমি রয়েছে। এভাবে বালু উত্তোলন করা হলে একসময় আমাদের আবাদি জমি হয়তো আর থাকবে না।’

 

কৃষক গেদা মাহমুদের ৩৫ শতাংশ আবাদি জমিও নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এখন বসতভিটাও হুমকির মুখে। একই এলাকার আরও কয়েকজন কৃষক তাঁদের জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

 

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জলিল, লিয়াকত হোসেন ও বেল্লাল বলেন, ‘নদীভাঙনে মানুষ এমনিতেই জমি ও বসতভিটা হারাচ্ছে। এর মধ্যে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হলে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়বে। ব্যক্তি মুনাফার জন্য নদী ও পরিবেশের ক্ষতি করা হচ্ছে।’

 

নদীতীরবর্তী গ্রাম, বসতভিটা ও আবাদি জমি রক্ষায় ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে তিস্তার ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একদিকে সরকারি অর্থে নদীভাঙন ঠেকাতে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সেই এলাকার কাছেই নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে—এতে সরকারি অর্থে নির্মিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটা টিকবে?

 

স্থানীয়দের আশঙ্কা, বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশে গভীরতা তৈরি হলে স্রোতের গতিপথ বদলে গিয়ে বাঁধ ও নদীতীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

 

বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী, বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীর ভাঙনের আশঙ্কা থাকলে অথবা নদীর ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য, জলজ ও স্থলজ প্রাণী, ফসলি জমি বা উদ্ভিদের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে সেখান থেকে বালু বা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ।

 

এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন, সেচ বা নদীভাঙন রোধে নির্মিত অবকাঠামোর সংলগ্ন এলাকা এবং বাঁধ, সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারেজ, সড়ক, রেললাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা আবাসিক এলাকার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে—এমন স্থান থেকেও বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ছোটখাতা কলম্বিয়া গাইড বাঁধের ‘টি’ বাঁধসংলগ্ন এলাকায় বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করা হচ্ছে।

 

অভিযোগের বিষয়ে রবিউল ইসলাম ভাকু বলেন, ‘ভাঙনের ফলে নদের মধ্যে আমাদেরও অনেক জমি আছে। সেই জমি ভরাট হওয়ায় সেখান থেকে বালু উত্তোলন করছি।’

 

তবে স্থানীয়দের দাবি, বালু উত্তোলনের পর তা বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়রা একাধিকবার বালু উত্তোলন বন্ধ করতে অনুরোধ করলেও তা বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, ‘তিস্তা নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি সরেজমিনে খতিয়ে দেখা হবে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, ‘ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

 

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version