মনিরুজ্জামান খান গাইবান্ধা:
জন্ম থেকেই নেই দুটি হাত। সেই শূন্যতাকে সঙ্গী করেই পা দিয়ে কলম ধরে, একে একে পেরিয়ে গেছেন এসএসসি, এইচএসসি, ডিগ্রি, এমনকি মাস্টার্সও। বলছিলাম গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার পূর্ব কচুয়া গ্রামের আয়েশা আক্তারের জীবন গল্প। প্রতিবন্ধকতাকে জয় করার এক জীবন্ত আয়েশা আকতার । আর দীর্ঘ এই সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে অবশেষে মিলেছে একটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান- গাইবান্ধার বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে চাকরি।
গত ৩০ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন তিনি। ১৯৯৩ সালে সাঘাটা উপজেলার পূর্ব কচুয়া গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম আয়েশার। জন্মগতভাবে দুটি হাত না থাকায় শুরু থেকেই গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে যান বাবা আব্দুল লতিফ ও মা ফাতেমা বেগম। অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচতে হবে-এই আশঙ্কা থেকেই আয়েশা নিজে নিজেই চেষ্টা শুরু করেন পা দিয়ে কাজ করার। ধীরে ধীরে রফত করেন কাঁথা সেলাই, রান্না করা, গোসল করা, মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ চালানোর মতো কাজ, এমনকি প্রয়োজনে ইট ভাঙার মতো কঠিন কাজও শুরু করেন আয়েশা আকতার ।
বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মেয়েকে সার্কাসে দিয়ে দেবেন। কিন্তু আয়েশা রাজি হননি। পড়ালেখার প্রতি জেদ আর স্বপ্নই তাকে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। এর মধ্যেই হারিয়েছেন দরিদ্র কৃষক বাবাকে। মায়ের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল- তার অবর্তমানে মেয়ের ভবিষ্যৎ কী হবে। প্রতিকূলতার কাছে কখনো হার মানেননি আয়েশা। পায়ের আঙুলে কলম ধরে লিখে ২০১২ সালে এসএসসি ও ২০১৪ সালে এইচএসসি পাস করেন তিনি, দুটি পরীক্ষাতেই পান জিপিএ-৫।
এরপর সাঘাটা উপজেলার উদয়ন মহিলা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে ডিগ্রি পাস করেন। পরবর্তীতে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) শেষ করে সম্প্রতি একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন, ফলাফলে আবারও প্রথম বিভাগ।উদয়ন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তারা আয়েশাকে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সাধ্যমতো সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আয়েশার পড়াশোনা যেমন তাদের গর্বের বিষয়, তেমনি সে নিজেও সমাজে অন্য সবার মতো ভূমিকা রাখতে পারছে বলে মনে করেন তিনি।
মাস্টার্স শেষ করার পর আয়েশা সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি বিনা পারিশ্রমিকে পড়াচ্ছিলেন গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে আয়েশা সবার বড়। পরিবারের বাকিরা হয় পড়ালেখা করছে, নয়তো বাবার ছোট ব্যবসায় সহযোগিতা করছে। দুটি টিনের দোচালা ঘরই তাদের সম্বল- একটিতে থাকেন আয়েশা ভাইবোনদের নিয়ে, অন্যটিতে বাবা-মা।আয়েশা বলেন, ছোটোবেলা থেকেই সমাজের অন্য সবার মতো হতে চেয়েছি।
পড়ালেখা করে তার অনেকটাই অর্জন করতে পেরেছি। বাবা-মায়ের অভাবের সংসারে সহযোগিতা করার জন্য একটা সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখে এসেছি সবসময়। মা ফাতেমা বেগম জানান, ছোট থেকেই কষ্ট করে বড় হয়েছে আয়েশা। তাদের একটাই চাওয়া ছিল- মেয়েটি যেন অন্য সবার মতো স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে, সমাজের বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়। সেই চেষ্টায় এখন পর্যন্ত সফল তাদের মেয়ে।আয়েশার দীর্ঘ সংগ্রাম, চোখের জল আর সাফল্যের এই যাত্রা নিয়ে নির্মিত হয়েছে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’।
প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের প্রযোজনায় নির্মিত এই তথ্যচিত্রের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ছিলেন চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি ও সিনিয়র সাংবাদিক মোস্তফা মল্লিক। সেই সময় শুধু একটা চাকরিরই অপেক্ষা ছিল, যা তার এত দিনের লড়াইকে দিতে পারে পূর্ণতা।আয়েশার একমাত্র স্বপ্ন ছিল একটি সম্মানজনক চাকরি, যেখানে নিজের যোগ্যতায় স্বাবলম্বী হয়ে মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারবেন।
সময়ের আলোতে তার সংগ্রামের গল্প প্রকাশিত হওয়ার পর সেই স্বপ্ন অবশেষে বাস্তবে রূপ নিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা আয়েশার কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেন। এরই ধারাবাহিকতায় গাইবান্ধার বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে চাকরি পেয়েছেন। গত ৩০ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছেন নতুন কর্মস্থলে। নতুন চাকরি পেয়ে সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন আয়েশা।



