শিশুদের শৈশবের সময়টা হচ্ছে পরিপূর্ণ একজন মানুষের জীবন গঠনের সময়। মূলত এ বয়সে মেধা ও প্রতিভা বিকাশের সময় হলেও ভোলার উপকূলীয় শিশুরা উত্তাল নদীতে দারিদ্রতার বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের নেশায় মত্ত্ব হয়ে ওঠে। যে বয়সে বই, পেন্সিল আর খাতা হাতে থাকার কথা, সেই বয়সে উপকূলীয় শিশুরা দারিদ্র্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ে নদীতে মাছ ধরতে নেমে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে উপবৃত্তির টাকা ও বিনা মূল্যের বই ওদের জন্যও বরাদ্দ থাকে। কিন্তু অনেকে এসব অনুদান নিয়েও পরিবারের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে কাজে নামতে বাধ্য হচ্ছে।

সকালের সূর্য মাত্র উঁকি দিচ্ছে। পূবের আকাশের আলোর ঝলকানিতে মেঘনার মিঠা পানি যেনো তার রুপের নানা রং মেলেছে। নদী পাড়ের চায়ের দোকানগুলোতে কাপ-পিরিচের টুংটাং শব্দ। আড়ৎগুলোর সার্টার খোলা, ভ্যান থেকে বরফ নামানোর দৃশ্য আর জেলেদের কোলাহলে যেনো অন্যরকম আবহ তৈরি হয় এ উপকূলীয় চরাঞ্চলে।

কাঁচিয়ার মাছঘাটে ইলিশ, পোয়া, পাঙ্গাস, বেলে, তপসে ও আইড়সহ হরেক রকম মাছের মেলা সাজিয়ে দর-দামের হাঁক ডাক দিচ্ছে ১২ বছরের শিশু তানজিল। তার সমবয়সী বহু শিশু বৈরী বাতাস আর উত্তাল নদীতে দারিদ্র্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ে মাছ ধরতে যেনো উন্মুখ হয়ে থাকে। পড়ালেখার প্রাথমিক তালিমের চেয়ে মাছ ধরার কৌশল রপ্ত করাই আসল শিক্ষা বলে মনে করেন উপকূলীয় জেলা ভোলা ও তৎসংলগ্ন প্রতিটি পরিবার। মাছ পেলে খাদ্য জোটে, না পেলে ক্ষুধার নিদারুণ কষ্ট বইতে হয় তাদের।

তানজিল জানায়, প্রতিদিন তার বাবার সাথে নৌকা আর জাল নিয়ে নামেন নদীতে। তানজিলরা ভাই-বোন ৪ জন। অভাব-অনটনের সংসারে দু’বেলা আহার জোটানোই যেখানে কষ্ট, সেখানে পড়া-লেখাতো দু:স্বপ্ন। তাই গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতেই আটকে গেছে তানজিলের শিক্ষা জীবন। পরিবারের দু’বেলা অন্য যোগাতে রাতজাগা নদীর জলরাশিতে জাল ছড়িয়ে কোমল হাতে নৌকার বৈঠা শক্তকরে ধরতে হয় তানজিল-সজিবদের।

কন্যা শিশুর পরিস্থিতি:

উপকূলের চরাঞ্চলের কন্যা শিশুরাও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। এ সব শিশুদেরকে ১২-১৪ বছর বয়সেই বিয়ে দেয়ার ফলে তারা অকালেই সংসারের চাপে পিষ্ট হচ্ছে।

সরেজমিনে জেলার সাগরকূলের জনপদ ঢাল চরে গিয়ে দেখা মেলে সেখানকার বাসিন্দা ১৪ বছর বয়সী রাবেয়া, ১৩ বছর বয়সী ফাতেমা আর ১৫ বছরের কিশোরী কন্যা সুমাইয়ার সাথে।
তারা জানান, কেউই প্রাথমিক স্কুলের কাছেও যেতে পারেনি। রাবেয়া জানায়, ভাত-কাপড়ের অভাবে ১৩ বছরেই বিয়ে দেয়া হয় তাকে। ১৪ বছরেই এখন সে শিশু সন্তানের মা’ হয়েছেন। অপুষ্টির কারণে রাবেয়া এখন প্রায় কঙ্কালসার।

মাছ ব্যবসায়ী, জেলে ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভাবের সংসার আর অসচেতনতায় অভিভাবকরা সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে মাছ ধরাতে নদীতে পাঠান।

অন্যদিকে নৌকাবাসী (মান্তা সম্প্রদায়) জেলেরা তাদের সন্তানদের নিয়ে সারা দিন নদীতে মাছ ধরে থাকেন। মাছ ধরা শেষে রাতে মেঘনা নদী সংলগ্ন কোনো না কোনো খালে আশ্রয় নেন।

সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের কালিকীর্তি নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মনির উদ্দিন বাসস’কে বলেন, তার স্কুলে চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া ৯ জন শিশু বাবার সঙ্গে প্রতিদিনই নদীতে মাছ ধরতে যায়। এরা দুই-তিন মাস পরে স্কুলে এসে কিছুদিন ক্লাস করে পরীক্ষা দেয়। এদের নিয়মিত করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মনে করছেন এ প্রধান শিক্ষক।

ভোলার পরিসংখ্যান কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় মোট জনসংখ্যা ১৯ লাখ ৩২ হাজার ৪৪৪ জন। এর মধ্যে ৫ থেকে ১৭ বছরের শিশু ৫ লাখ ২৬ হাজার ৩৬৪ জন। কর্মজীবী শিশুর সংখ্যা ৪৬ হাজার ৮৪৬, যার মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত ২৩ হাজার ১৬০ জন। তবে এ দপ্তরটির কাছে শিশু জেলের কোনো পরিসংখ্যান নেই।

জেলা মৎস্য কার্যালয়ের হিসাবে জেলায় ছোট-মাঝারি নৌকা আছে প্রায় ১৮ হাজার। সাগরগামী ফিশিংবোট আছে ৭ হাজার।

একাধিক জেলে, মৎস্য আড়ৎদার ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গড়ে দু’জন করে শিশু জেলে মাছ ধরায় নিয়োজিত থাকলেও ভোলায় ৩৬ হাজার শিশু জেলে এ পেশায় জড়িত।

এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হেসেন বাসস’কে বলেন, ভোলায় কি পরিমাণ শিশু জেলে নৌকায় কাজ করছে তার সঠিক কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে তারা নিষেধাজ্ঞাকালীন সময় মাঝিদের (নৌকার প্রধান)’কে শিশুদের মাছ ধরতে যেন নেয়া না হয়। কিন্তু তারা শিশুদেরই মাছ ধরতে পাঠায়। কারণ, নিষেধাজ্ঞা অমান্যে শিশুদের জেল-জরিমানা হয় না।

জেলা সিভিল সার্জন মো. মনিরুজ্জামান বাসস’কে বলেন, শিশুদের জন্য এ পেশা অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ। সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে শিশুর স্কিন-ক্যানসার হওয়ার শঙ্কাও বেশি। এ ছাড়া শিশু জেলেদের মানসিক বিকাশ ও শারীরিক সক্ষমতা হ্রাসসহ সব দিক দিয়েই এরা শৈশবকালের অধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো.আমিনুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, জেলে পেশায় সম্পৃক্ত শিশুদের কোনো তালিকা কেন্দ্রীয়ভাবে আমাদের কাছে নেই; তবে শিশুদের স্কুলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রত্যেক স্কুলে প্রতিমাসে শিক্ষকদের মাধ্যমে আমরা ‘মা’ সমাবেশ করে থাকি। উপকূলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল বিমূখ এসব শিশুদের পরিসংখ্যান তৈরিতে বর্তমান সরকার সচেষ্ট বলেও জানান এ কর্মকর্তা।

ভোলা জেলা প্রশাসন শিশুশ্রম নিরসনে চলতি বছরের ১২ মার্চ জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ মনিটরিং সভায় শিশুদের স্কুলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সচেতনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে এক আলোচনা সভা হয়।

এ সময় বরিশাল মহাপরিদর্শক কার্যালয়ের উপ মহাপরিদর্শক ডা. নবীন কুমার হাওলাদারসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বরিশাল বিভাগীয় শিশুশ্রম পরিবীক্ষণ কমিটির (DCLMC) আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সভায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের মুক্ত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বাসস’কে বলেন, আমরা উপকূলীয় শিশুশ্রম বন্ধে এখানকার শিশু সুরক্ষায় বর্তমান সরকারের নেয়া নানামুখী কর্মসূচি ইতিমধ্যেই শুরু করেছি।

তিনি বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারলে উপকূলীয় অঞ্চল থেকে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নির্মূল করা কঠিন হবে। তাই দলমত নির্বিশেষে শিশুদের কল্যাণে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন জেলা প্রশাসনের এ শীর্ষকর্তা।

Share.
Leave A Reply

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ Themailbd.com. Designed by themailbd.com.
Exit mobile version