নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ মডেল মসজিদস্থ ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা) কার্যালয়ে (সোমবার) বেলা ১১টার দিকে নজিরবিহীন অনিয়ম, জোরপূর্বক ব্ল্যাংক চেক আদায়ের চেষ্টা এবং এর প্রতিবাদ করায় এক শিক্ষক নেতাকে বেধড়ক মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অমান্য করে তৃতীয় শ্রেণির (বিভাগপ্রাপ্ত) শিক্ষকদের বেতনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে বিপাকে পড়েছেন নেত্রকোনা ইফার উপপরিচালক (ডিডি) মো. শাহ আলম। আর নিজের প্রশাসনিক ভুল ও আর্থিক দায় এড়াতে ভুক্তভোগী শিক্ষকের কাছ থেকে জোরপূর্বক ফাঁকা চেক (ব্ল্যাংক চেক) নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে খোদ ইফা কার্যালয়ের ভেতরেই হামলার শিকার হয়েছেন জেলা দারুল আরকাম এবতেদায়ী মাদরাসার শিক্ষক কল্যাণ সমিতির সভাপতি সোলাইমান হোসেন।
জানা যায়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন নেত্রকোনা কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে জেলায় ১৯টি দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদরাসায় দারুল আরকাম ইসলামি শিক্ষা পরিচালনা ও সুসংহতকরণ (২য় পর্যায়) প্রকল্প দীর্ঘদিন স্থগিত থাকার পর সম্প্রতি অনুমোদন পায়। অনুমোদন লাভের পর শিক্ষকরা একসাথে এক বছরের বকেয়া বেতন হাতে পান। বেতন প্রদানের পূর্বে শিক্ষকদের সনদ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যেখানে সুস্পষ্ট শর্ত ছিল কোনোভাবেই তৃতীয় শ্রেণি বা বিভাগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
কিন্তু, নেত্রকোনা কার্যালয় এই নির্দেশনার চরম বরখেলাপ করেছে। গত ২১ জুন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক (সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ) আ. হান্নান খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে নেত্রকোনার উপপরিচালক মো. শাহ আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নেত্রকোনা কার্যালয় হতে গত ৫ মে প্রেরিত সম্মানী শীটে দুজন তৃতীয় শ্রেণিধারী শিক্ষকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং তাদের একজনের অনুকূলে সম্মানীর অর্থ পরিশোধও করা হয়েছে। সরকারি অর্থের এই অনিয়মিত ব্যয়ের কারণে পরিশোধিত অর্থ কেন উপপরিচালক শাহ আলমের নিকট হতে আদায় করা হবে না এবং তার বিরুদ্ধে কেন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না- সে বিষয়ে তিন কার্যদিবসের মধ্যে সুস্পষ্ট লিখিত জবাব চাওয়া হয় ওই চিঠিতে।
আরো জানা যায়, মহাপরিচালকের কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়ার পরই উপপরিচালক শাহ আলম অনিয়ম ও দুর্নীতি থেকে নিজেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। উপপরিচালক এই টাকা উদ্ধারের জন্য ১০ জন শিক্ষককে নিয়োগ করেন এবং তৃতীয় বিভাগ প্রাপ্ত রবিউল ইসলাম মোহনগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও দারুল আরকাম এবতেদায়ী মাদরাসায় দীর্ঘদিন যাবৎ শিক্ষকতা করছেন।
ভুক্তভোগী রবিউল ইসলাম জানান, বিগত এক বছর বেতন না থাকায় ধারদেনা করে তাকে চলতে হয়েছে এবং একবারে বেতন পাওয়ার পরপরই তিনি সেই ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছেন। এই মুহূর্তে তার কাছে নগদ অর্থ না থাকায় উপপরিচালকের লোকজন তার ওপর অর্থ দেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। উপপরিচালক মহোদয় আমাকে এ বিষয়ে কিছু না জানিয়ে বিভিন্ন উপজেলা থেকে ১০ জন শিক্ষক পাঠিয়ে মোহনগঞ্জ উপজেলা কার্যালয়ে আমাকে ডেকে এনে বিগত এক বছরে প্রাপ্ত বেতন-ভাতা বাবদ টাকা ফেরৎ দিতে চাপ প্রয়োগ করেন। উপপরিচালক মহোদয় আমাকে ডাকলেই আমি উনার অফিসে গিয়ে বিষয়টি সমাধান করতে পারতাম।
উপজেলা অফিসে ডেকে এনে সহকর্মীর ওপর এমন অবিচারের তীব্র প্রতিবাদ জানান জেলা শিক্ষক কল্যাণ সমিতির সভাপতি সোলাইমান হোসেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যেহেতু শিক্ষকরা বিপদে আছেন, তারা অঙ্গীকারনামা দিতে পারেন বা হেড অফিস চাইলে টাকা ফেরত দেবেন, কিন্তু তাদের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক কেন দিতে হবে?’।
সোলাইমান হোসেন আরও অভিযোগ করে বলেন, ‘উপপরিচালক মো. শাহ আলমের লোকজন যখন অন্যায্যভাবে শিক্ষকদের ওপর ব্ল্যাংক চেক দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করছিলেন, তখন আমি এর তীব্র প্রতিবাদ করি। প্রতিবাদের একপর্যায়ে নেত্রকোনার বারহাট্টা নল্লা দারুল আরকাম এবতেদায়ী মাদরাসার শিক্ষক আবুল হাশেম এবং তার সহযোগীরা আমার ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং বেধড়ক মারধর করে আমাকে।’
শিক্ষক আবুল হাশেমের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সাথে তার সম্পৃক্ততার কথা সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সাথে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আত্মীয়ের বিয়েতে বারহাট্টার সাহতা এলাকায় রয়েছেন।’ একপর্যায়ে তিনি (হাশেম) নিজেকে ওলামা দলের সভাপতি পরিচয় দেন এবং শিক্ষক সোলাইমান হোসেনকে ফ্যাসিবাদী আওয়ামীলীগের তকমা দেন।
অন্যদিকে, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নেত্রকোনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. শাহ আলম কারণ দর্শানোর চিঠির বিষয়টি স্বীকার করে জানান, তৃতীয় শ্রেণি বা বিভাগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নাম ভুলবশত সম্মানী শীটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং একজনের অর্থ পরিশোধও হয়েছিল। তিনি জানান, এই ভুলের বিষয়টি মহাপরিচালককে অবহিত করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে ব্ল্যাঙ্ক চেক আদায়ের বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর প্রদান করেননি।



