সোমবার, অক্টোবর ১২

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি ছিল আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ, উচ্চশিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধারণ করার একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।

তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কর্তৃক ২০০৫ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং ২০০৬-২০০৭ শিক্ষাবর্ষে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর পর প্রায় দুই দশকের যাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয়টি নানা সাফল্য অর্জন করেছে। তবে প্রতিষ্ঠার সময় যে প্রত্যাশাগুলো ছিল, সেগুলোর কতটুকু পূরণ হয়েছে এবং ভবিষ্যতে কী করণীয়; তা নিয়ে একটি বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন সময়ের দাবি।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল প্রত্যাশা ছিল কবি নজরুল ইসলামের অমর স্মৃতি সংরক্ষণ, তাঁর জীবন ও দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী চেতনার প্রসার। পাশাপাশি বৃহত্তর অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য ছিল।

সেই আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পেছনে কয়েকটি মৌলিক প্রত্যাশা কাজ করেছিল। প্রথমত, বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে একটি মানসম্মত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ। সে সময় দেশের অধিকাংশ সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগরকেন্দ্রিক ছিল। ফলে উত্তর-মধ্যাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শক্তিশালী উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, দর্শন, সংস্কৃতি, সাম্য, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিকতার চেতনাকে গবেষণা ও শিক্ষার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন ও সৃজনশীল নাগরিক তৈরি করা। দেশের বাইরেও তাঁর সৃষ্টিকর্মকে পরিচিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে কৈশোরে কবির স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে সংরক্ষণ ও বিকাশ করা। তৃতীয়ত, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন এবং সংস্কৃতিচর্চার সমন্বয়ে একটি আধুনিক ও বহুমাত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা, যা জাতীয় উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

চতুর্থত, ত্রিশালকে কেন্দ্র করে একটি জ্ঞানভিত্তিক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তৈরি করা, যা স্থানীয় উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ঘিরে এই অঞ্চলকে সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি উল্লেখযোগ্য কিছু সাফল্য প্রাপ্তির ঝুলি হিসেবে অর্জন করেছে।

যেমন–  এক. একাডেমিক সম্প্রসারণ: চারটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬টি অনুষদের অধীনে ২৫টি বিভাগ ও নজরুল ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে; আরো কিছু বিভাগ ও ইনস্টিটিউট চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। মানবিক, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, অর্থনীতি, আইন, সংগীত, চারুকলা ও নাট্যকলাসহ নানা বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। রয়েছে কবি নজরুল-এর আদর্শ ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে গবেষণার সুযোগ।

এটি নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠাকালের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা পূরণের উদাহরণ। দুই. সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিকাশ: বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নজরুলচর্চা, সংগীত, নাটক, চারুকলা ও সংস্কৃতিভিত্তিক কার্যক্রমে জাককানইবির একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হয়েছে। জাতীয় কবির নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। তিন. গবেষণায় অগ্রগতি: গত এক দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কম্পিউটার বিজ্ঞান, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য, সামাজিক বিজ্ঞান, আইন এবং ব্যবসায় শিক্ষা ক্ষেত্রে গবেষণামূলক কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক ও গবেষকদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং বিশ্বমানের প্রকাশনায় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে গবেষণার ভিত্তি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে। চার. দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি: দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাককানইবির শিক্ষার্থীরা সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে, যা প্রতিষ্ঠানটির সামাজিক প্রভাবকে আরও দৃঢ় করছে।

পাঁচ. আঞ্চলিক উন্নয়নে ভূমিকা: ত্রিশাল এবং আশপাশের এলাকার অর্থনীতি, যোগাযোগ, আবাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিবাচক প্রভাব সুস্পষ্ট। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে জ্ঞাননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতি গড়ে ওঠে, জাককানইবি তার বাস্তব উদাহরণ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিটি বিভাগের জন্য ‘নজরুল অধ্যয়ন’ কোর্স বাধ্যতামূলক করা হয়, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কবি নজরুলের জীবন-দর্শন ও আদর্শ নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পায়। সাফল্যের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টির কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সীমাবদ্ধতা রয়েছে গবেষণা অবকাঠামোয়, আন্তর্জাতিকীকরণে, অবকাঠামোগত উন্নয়নে ও শিল্প-শিক্ষা সংযোগে।

বিশ্বমানের গবেষণার জন্য প্রয়োজন আধুনিক ল্যাবরেটরি, পর্যাপ্ত গবেষণা অনুদান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। এই ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় এখনও কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং এবং যৌথ গবেষণা কার্যক্রম বিস্তৃত করার প্রয়োজন রয়েছে। নেই বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি। যদিও ক্যাম্পাসে অনেক উন্নয়ন হয়েছে, তবুও আবাসন, গবেষণাগার, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ এবং স্মার্ট ক্যাম্পাস সুবিধার ক্ষেত্রে উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে।

তাছাড়া কাঙ্খিত শিক্ষার্থীসেবার অভাব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবনকে শিল্পখাতের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে গবেষণার ফল বাস্তব অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে আগামী দশকে একটি গবেষণানির্ভর, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে।

এর জন্য কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন: গবেষণা বাজেট ও গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি; আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও একাডেমিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ; পিএইচডি ও পোস্টডক্টরাল গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা; শিল্পখাত ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের সঙ্গে একাডেমিক কার্যক্রমের সংযোগ বৃদ্ধি; ডিজিটাল ও স্মার্ট ক্যাম্পাস বাস্তবায়ন; বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি চালুকরণ; বিশ্ব র‌্যাংকিং ও গবেষণা সূচকে অবস্থান উন্নত করা; এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল গবেষণাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা এখনও তুলনামূলকভাবে নবীন।

কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিষ্ঠাকালের সব প্রত্যাশা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলেও একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতের উন্নয়নের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করে। জাতীয় কবির নামে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো: শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে একটি মানসম্মত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হওয়া।

সেই লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী, অ্যালামনাই, নীতিনির্ধারক এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পরে এসে বলা যায়, জাককানইবি তার স্বপ্নযাত্রার পথেই রয়েছে; এখন প্রয়োজন গতি, গুণগত উৎকর্ষ এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাহলেই বিশ্ববিদ্যালয়টি সত্যিকার অর্থে জাতীয় কবির আদর্শের একটি আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। – লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত), জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ। ই-মেইল: mijanjkkniu@gmail.com

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version