কক্সবাজারের আকাশে ঈদের চাঁদ উঠলেই রোহিঙ্গাদের মনে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সেই বহুল আলোচিত আশ্বাস—‘এই ঈদত পাইত্যাম ন, আল্লাহর কাছে দোয়া গরি সামনার বার য্যান অনরা নিজের বাড়িত যাইয়্যেরে ঈদ গরিত পারন।’ অর্থাৎ এই ঈদে (২০২৫) পারব না, আল্লাহর কাছে কামনা করি, সামনেরবারের ঈদ (২০২৬) যেন আপনারা নিজ দেশের ঘরে ফিরে করতে পারেন।
কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি এখন শুধু কথার ফুলঝুরিতেই আটকে আছে। রোহিঙ্গাদের তো নিজ দেশে ফেরানো যায়ইনি, উল্টো নতুন করে দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। তাই ড. ইউনূসের সেই প্রতিশ্রুতি এখন ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের খোরাকে পরিণত হয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ,ক্যাম্পের ঘিঞ্জি গলিতে একরাশ হতাশা আর বিদ্রুপের সুর তীব্র হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের পবিত্র রমজানের সেই বহুল আলোচিত ইফতারে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে পাশে বসিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় দেওয়া আশ্বাস তো কোনো কাজে আসেইনি, উল্টো রোহিঙ্গাদের অপেক্ষার প্রহর আরো দীর্ঘ হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রত্যাবাসন তো দূরের কথা, মায়ানমারের রাখাইনে চলমান অস্থিরতায় সীমান্তে অনুপ্রবেশের গতি মোটেই থামেনি।
যদিও গত ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদে দেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত আট লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মায়ানমার সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে দুই লাখ ৫৩ হাজার ৯৬৪ জনকে তারা আগের বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান স্বীকার করেছেন, আলোচনা চলমান থাকলেও মাঠ পর্যায়ে প্রত্যাবাসনের কার্যকর কোনো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
৯ বছর ধরে প্রতি ঈদে কোরবানির পশুর হাটের দিকে তাকিয়ে রোহিঙ্গারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশ্রিত রোহিঙ্গা রুহুল আমিন বড় আক্ষেপ নিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সত্যি রোজার ঈদ আর কোরবানির ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই ড. ইউনূসের আশ্বাসের কথাটি বেশি বেশি মনে পড়ে। তিনি গত রমজানের আগের রমজানে (২০২৫) আমাদের এখানে কুতুপালং ক্যাম্পে এসে বলেছিলেন, আমাদের ২০২৬ সালের ঈদে দেশে নিয়ে যাবেন।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে রুহুল বলেন, ‘পরিবারের ছয় সদস্য নিয়ে ভীষণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছি ক্যাম্পে।’
উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পের রোহিঙ্গা হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ড. ইউনূস যেহেতু একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তি, সেহেতু উনার আশ্বাসে আমরা দেশে ফেরার স্বপ্নে বিভোর ছিলাম। কিন্তু দেশে ফেরা আমাদের হলো না।’ হামিদের কষ্ট হচ্ছে, ক্যাম্প জীবন। তিনি আরাকানের সাহেববাজারের বাসিন্দা। সেখানে ছিল জমি, ২২টি গরু ও ১৮টি ছাগল। সুখের সংসার ফেলে এখন বসবাস করতে হচ্ছে আট হাত বাই আট হাতের একটি পলিথিন ঘেরা কক্ষে।
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস মূলত দেড়টি বছর ক্ষমতায় থেকে দেশের বলুন আর রোহিঙ্গাদের বলুন, কারো কাজে আসেননি। তিনি ক্ষমতায় থেকে কেবল নিজের ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা ভেবেছেন।
রোহিঙ্গা কমিটি ফর পিস অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশনের (আরসিপিআর) সভাপতি রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার দীল মোহাম্মদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৯৭৮ সালে আসা সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করিয়েছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরে ১৯৯১ সালে আসা রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়েও কাজ করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাই আমরা মনে করছি, এবার ক্ষমতায় আসা সরকারই সঠিক উদ্যোগ নিয়ে আমাদের দীর্ঘকালের সমস্যা সমাধান করতে পারবে।’



