পল্লবীতে নিহত শিশু রামিসা আক্তারের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। স্বজনদের সামনে আহাজারির সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি কিছুই চাই না। বিচার আপনারা করতে পারবেন না। আপনাদের এ ধরনের কোনো রেকর্ড নেই। আপনারা পারবেন না। আমার মেয়েও ফিরে আসবে না। আপনারা বিচার করতে পারবেন? পারবেন না। কোনো এক্সাম্পল দাঁড় করাতে পারবেন না। বড়জোড় ১৫ দিন। এরপর বড় কিছু ঘটবে, আর ধামাচাপা পড়ে যাবে।’
মঙ্গলবার সকালের পল্লবী ১১ নম্বর সেকশনের ৭ নম্বর অ্যাভিনিউয়ের একটি বাসায় প্রতিবেশী দ্বারা প্রথমে ধর্ষণ ও পরে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয় শিশু রামিসা। প্রথমে প্রতিবেশীর স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ও পরবর্তী সময়ে তার স্বামী সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
বুধবার ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোহেল রানা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আদালত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার বিকেল ৩টার দিকে রামিসার মরদেহ নিয়ে আসা হয় পল্লবীর বাসার সামনে। কয়েকশ নারী-পুরুষ জড়ো হয় সেখানে। সবার মাঝে দেখা গেছে উৎকণ্ঠা; সঙ্গে ক্ষোভ। আট বছরের শিশুকে এভাবে হত্যা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না আশপাশের লোকজন।
রামিসাকে বহন করা লাশবাহী গাড়িটি বাসার সামনে আসতেই মেয়েকে একনজর দেখার জন্য এগিয়ে যান বাবা হান্নান মোল্লা। কিন্তু সহ্য করতে পারেননি। কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় পড়ে যান। কয়েকজন ধরে তাকে বাসার নিচতলায় নিয়ে যান। কিছুক্ষণ চেষ্টার পর জ্ঞান ফিরে তার।
এদিকে তিনতলায় রামিসার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দুই কক্ষের বাসায় রামিসার বড় বোন রাইসা ও মা পারভীন আক্তারকে ঘিরে আছেন স্বজনরা। কিছুক্ষণ পরপর ডুকরে কাঁদছেন পারভীন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলছিলেন, আমার মেয়ে নিচে কেন? ওকে ওপরে আনো। আমার বুকে এনে দাও। আমার বুকটা পুড়ে যাচ্ছে। আমার কলিজার ধনকে এনে দাও।
মায়ের পাশে বসে অঝোরে কাঁদছিল রাইসা। কিছুতেই মানতে পারছে না বোনের এমন নির্মম মৃত্যু।
রামিসার মরদেহ বাসার সামনে আনার পর নারীদের একটি গ্রুপ প্রতিবাদ মিছিল করে। ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’ ব্যানারে নারীরা প্রতিবাদ জানান। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডগুলোয় লেকা ছিল—প্রশাসন ও সমাজ এক হোক, যৌন নির্যাতন চিরতরে শেষ হোক; রামিসা হত্যার বিচার চাই, শিশু হত্যার অবসান চাই; ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও হত্যা বন্ধ করো। নিরাপদ সমাজ গড়; আর কত মৃত্যু হলে যৌন নির্যাতন বন্ধ হবে?
রামিসাকে একনজর দেখতে কাজীপাড়া থেকে এসেছেন জান্নাত আরা নামের একজন নারী। তিনি বলেন, গতকাল (মঙ্গলবার) খবরে দেখে খুব খারাপ লাগছিল। তাই এখানে আসছি। মেয়েটার বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কী সান্ত্বনা দেব? আমারও একটা মেয়ে আছে। ভেবেই খুব কষ্ট হচ্ছে। এমন হত্যার বিচার চাই।
বিচারব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় উপস্থিত অনেককে। ভিড়ের মধ্য থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, দেশে বিচার ঠিকঠাক হয় না বলে পশুগুলো এত সাহস পায়। কঠিন শাস্তি দেওয়া দরকার।
নিহত রামিসার স্বজনরা জানিয়েছেন, তার মরদেহ পল্লবীতে একবার জানাজা হবে। এরপর নেওয়া হবে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে। সেখানে এশার নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
রামিসা পল্লবীর পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। মঙ্গলবার সকালে প্রতিবেশী সোহেল রানা তাকে কৌশলে নিজের বাসায় নিয়ে টয়লেটে ধর্ষণ করে। ঘটনা ধামাচাপা দিতে দেহ টুকরো টুকরো করে, জবানবন্দিতে জানিয়েছে সোহেল।
রামিসাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে প্রতিবেশীর বাসার সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পান মা পারভীন আক্তার। ভেতরে থাকতে পারে এমন সন্দেহে ডাকাডাকি করেন। কিন্তু ভেতর থেকে দরজা না খোলায় সন্দেহ আরও বাড়ে পারভীনের। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজনও ছুটে আসে। একপর্যায়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে প্রতিবেশী সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্নাকে পাওয়া যায়। খোঁজাখুঁজি করে রামিসার মাথাবিহীন শরীর পাওয়া যায় খাটের নিচে। আর মাথা পাওয়া যায় টয়লেটের ভেতরে একটি বালতির মধ্যে। তবে ততক্ষণে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল।
পরে ৯৯৯-এ কল করলে পুলিশ এসে স্বপ্নাকে আটক করে। পল্লবী থানায় সোহেল ও স্বপ্নার বিরুদ্ধে মামলা করেন রামিসার বাবা হান্নান মোল্লা। পরবর্তী সময়ে মঙ্গলবার রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।



