নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনা জেলায় টানা কয়েকদিনের বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নিচু এলাকা ও হাওরের হাজার হাজার হেক্টর জমির আধাপাকা ও পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করার কাজ চলমান রেখেছেন। একদিকে মাঠের ধান পানিতে নিমজ্জিত, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট ও ধান কাটার বাড়তি খরচে চরম বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলার ১০ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে ক্ষয়ক্ষতি ও ধান কাটার যে চিত্র জানা যায়, কলমাকান্দার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের শনিবার (২ মে) প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলমাকান্দায় হাওর এলাকায় ৪ হাজার ৬৩০ হেক্টর আবাদের মধ্যে ২ হাজার ৪৩০ হেক্টর (৫২.৪৮%) ধান কাটা হয়েছে। তবে হাওরের ১ হাজার ৪৮০ হেক্টর (৩১.৯৬%) জমি বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ বা নিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে। অপরদিকে নন-হাওর এলাকায় ১৬ হাজার ৪৪৫ হেক্টর আবাদের মধ্যে ৪ হাজার ১১১ হেক্টর (২৫%) ধান কাটা হয়েছে এবং ১ হাজার ২৩৫ হেক্টর (৭.৫%) জমি ঝুঁকিতে রয়েছে।
খালিয়াজুরীর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, এ উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এ পর্যন্ত সার্বিকভাবে ৫৪ শতাংশ এবং হাওরাঞ্চলে ৫৭ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। তবে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে প্রায় ৬ হাজার ২০০ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ ডুবে গেছে এবং বাকি জমির প্রায় ৮০ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মদন উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান মিজানের দেওয়া তথ্যমতে, মদনে ১৭ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ৯৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। সার্বিকভাবে উপজেলায় ৯ হাজার ৬৫ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে পানিতে নিমজ্জিত হয়ে প্রায় ১ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে আনুমানিক সাত-আট হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
মোহনগঞ্জ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুশ শাকুর সাদী জানান, উপজেলায় ১৬ হাজার ৯৮০ হেক্টর বোরো আবাদের মধ্যে হাওরে ৬ হাজার ১০০ হেক্টর এবং নন-হাওরে ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। এখানে প্রায় ৫৫০ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে এবং সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জন। তিনি আরও জানান, কৃষি যন্ত্রপাতি (হারভেস্টার) ও শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকদের ধান কাটতে প্রতি একরে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি খরচ গুনতে হচ্ছে। যা কৃষকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিকভাবে চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেত্রকোনার সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহনুমা নওরীন জানিয়েছেন, সদর উপজেলায় বোরো আবাদের পরিমাণ ২১ হাজার ৮১০ হেক্টর। বৃষ্টির কারণে ৪৯৫ হেক্টর জমি নিমজ্জিত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় এ পর্যন্ত আনুমানিক সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে।
পূর্বধলা উপজেলার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জুবায়ের হোসেনের তথ্যমতে, পূর্বধলায় ২১ হাজার ৮২২ হেক্টর বোরো আবাদের মধ্যে ১৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। এ উপজেলায় প্রায় ৫৫০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তা উজ্জল সাহা জানান, কেন্দুয়ায় ২০ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৬২০ হেক্টর বা প্রায় ১০ শতাংশ জমির ধান এ পর্যন্ত কাটা হয়েছে। অতিবৃষ্টিতে উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ৩১০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে চূড়ান্ত ক্ষয়-ক্ষতি পরিমাণ নির্ধারণ চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
আটপাড়ার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়জুন নাহার নিপা জানান, উপজেলায় ১২ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকার পরিমাণ ১ হাজার ৪০০ হেক্টর। এখন পর্যন্ত ৩৮ শতাংশ অর্থাৎ ৪ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। দুর্যোগের কারণে আজ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি আক্রান্ত বা নিমজ্জিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।
দুর্গাপুরের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিপা বিশ্বাস জানিয়েছেন, এ উপজেলায় কোনো হাওর অঞ্চল নেই। উপজেলায় ১৭ হাজার ৬০৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২১ শতাংশ বা প্রায় ৩ হাজার ৭১০ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে প্রায় ১৪৪ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে এবং এটার পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বারহাট্টা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা জানান, এ উপজেলায় হাওর না থাকলেও বিল ও নিচু এলাকার জমিগুলোতে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বারহাট্টায় ১৫ হাজার ৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী এ উপজেলায় গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৮ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। অতিবৃষ্টি ও দুর্যোগের কারণে এখন পর্যন্ত ৫৮২ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত রয়েছে।

