শেখ শামীম: নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার সীমান্তবর্তী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা রামনাথপুর। চারপাশের সবুজ আর পাহাড়ের বুক চিরে একসময় এই এলাকার মানুষের মনে জেগেছিল বড় এক অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন- একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর। সেই স্বপ্ন আজ দেড় যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবতার মুখ দেখেনি। প্রায় ১৭ বছর ধরে প্রস্তাবিত ‘রামনাথপুর স্থলবন্দর’ প্রকল্পটি কেবল কাগজ-কলমের হিসাব, চিঠি চালাচালি আর দপ্তরীয় জটিলতার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে সীমান্তবাসীর মনে দিন দিন বাড়ছে হতাশা ও ক্ষোভ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে ‘রামনাথপুর আমদানি-রপ্তানিকারক (অভ্যন্তরীণ) ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ এর উদ্যোগে স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া প্রথম শুরু হয়। সে সময় বৈধ বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের আশায় বুক বেঁধেছিলেন এলাকাবাসী। দীর্ঘ ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় সেই রঙিন স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার কালো মেঘে ঢেকে গেছে।
দীর্ঘ স্থবিরতা নিয়ে রামনাথপুর আমদানি-রপ্তানিকারক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহাব আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আমরা স্থলবন্দর বাস্তবায়নের আশায় বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছি। ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া থাকলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় আমরা চরম হতাশ।”
রামনাথপুর গ্রামের আদিবাসী বাসিন্দা মতিশ ম্রং জানান, স্থলবন্দর চালু হলে এলাকায় বৈধ বাণিজ্য বাড়বে, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং অবৈধ বা অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল বলেন, “এই স্থলবন্দরটি বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত হবে এবং সীমান্তবাসীর জীবনমান জাদুকরীভাবে বদলে যাবে।”
স্থলবন্দর না থাকায় অতীতে এই সীমান্ত এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য ও চোরাচালানের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। যদিও বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযানে এসব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, বৈধ স্থলবন্দরই পারে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে।
এ বিষয়ে কলমাকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ শামীম বলেন, “স্থলবন্দর চালু হলে সীমান্ত এলাকায় চোরাকারবারে ‘জিরো টলারেন্স’ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি পরিবহন, গুদামজাতকরণ, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সরকারও প্রতিবছর পাবে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।”
প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. মিকাইল ইসলাম জানান, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
অন্যদিকে, নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব পাওয়া গেলে তা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ঝুলে থাকা রামনাথপুর স্থলবন্দর প্রকল্পটি এখন কেবলই সীমান্তবাসীর আশা-হতাশার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি- সরকারি সিদ্ধান্তে দ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে অবহেলিত এই জনপদে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচন করা হোক।

