নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রেম করে ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়ে করার ক্ষোভ এবং পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ না দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যে গ্রাম্য শালিস বসিয়ে এক পরিবারকে গ্রামছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে আপন ভাই ও স্থানীয় মাতব্বরদের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ কল করে পুলিশের হেফাজতে থানায় অবস্থানকালেই ভুক্তভোগীর বসতবাড়িতে লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে ভিটেমাটি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় নেত্রকোনা জেলা টেলিভিশন ও অনলাইন সাংবাদিক ফোরাম কার্যালয়ে (সাতপাই নদীর পাড়) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী সীমা রানী চক্রবর্তী ওরফে নুরুন্নাহার খানম (৪০) ও তার স্বামী মো. আব্দুল খালেক (৫২)।
ঘটনাটি ঘটেছে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার বলাইশিমুল ইউনিয়নের কুমারউড়া গ্রামে। দীর্ঘ ১৫-১৭ দিন ধরে বাড়িঘর হারিয়ে রাস্তায় রাস্তায় দিনাতিপাত করা এই পরিবারটি সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জীবনের নিরাপত্তা ও মাথা গোঁজার ঠাঁই দাবি করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়ে নুরুন্নাহার খানম জানান, তিনি আগে হিন্দু ছিলেন এবং তার নাম ছিল সীমারানী চক্রবর্তী। প্রায় ৩৫ বছর আগে (১৯৯২ সালে) তিনি মো. আব্দুল খালেকের সাথে প্রেমের সম্পর্কের জেরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর থেকেই তার বড় ভাই শিবনাথ চক্রবর্তী (ভুলন) তাদের মেনে নেননি। বিয়ের পরপরই শিবনাথ মিথ্যা অপহরণ মামলা দায়ের করেছিলেন। যা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায় এবং তার স্বামী আব্দুল খালেক নির্দোষ প্রমাণিত হন। দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে তারা একই গ্রামেই বসবাস করে আসছিলেন। তবে সম্প্রতি নুরুন্নাহারের বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তিনি ভাইয়ের কাছে পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ চাইলে দ্বন্ধ চরম আকার ধারণ করে। ভাই শিবনাথ তাকে এক শতাংশ জমিও দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন।
আব্দুল খালেক জানান, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে শিবনাথ চক্রবর্তী স্থানীয় মাতব্বরদের সাথে হাত মেলান। চলতি মাসের গত ৭ এপ্রিল তাদের না জানিয়েই গ্রামে একতরফা শালিস বসানো হয়। ওই শালিসে আলী আকবর তালুকদার মল্লিক, রিটন, খোকন, সম্রাট, শাহজাহান মাস্টার, শিবলী, কালাম ও মকবুলসহ কয়েকজন মাতব্বর সিদ্ধান্ত নেন, নুরুন্নাহার ও তার পরিবারকে গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করা হবে। তারা এসে পরিবারটিকে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেন। পৈতৃক ভিটা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে মাতব্বরদের লেলিয়ে দেওয়া দুষ্কৃতিকারীরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের বাড়িতে হামলা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে।
হামলার মুখে দিশেহারা হয়ে নুরুন্নাহার ট্রিপল নাইনে (৯৯৯) কল করেন। ও্ইদিন দুপুর ৩টার দিকে কেন্দুয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। নুরুন্নাহার ও তার স্বামীর অভিযোগ, পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে উল্টো জানায়, এলাকা তাদের জন্য নিরাপদ নয়। পুলিশ তাদের বাড়িঘরে তালা লাগিয়ে চাবি পুলিশের হাতে তুলে দিতে বাধ্য করে। এরপর পুলিশ অফিসার নূর ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ তাদের থানায় নিয়ে যায়।

আব্দুল খালেক জানান, গত ৮ এপ্রিল মিথ্যে মামলায় পুলিশ তাদেরকে আদালতে চালান করলে জামিনে বের হন। পুলিশ তাদের ছেলেকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তাদের ছেলে জামিন না পেয়ে কারাগারে বন্দি আছেন। বাড়িঘর ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় গত ২১ এপ্রিল তারা পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করে কেন্দুয়া থানায় অভিযোগ জমা দিলেও ওসি এজাহারটি এফআইআর করেননি।
নুরুন্নাহার অভিযোগ করে আরও বলেন, তার ভাই শিবনাথ চক্রবর্তী একজন দুশ্চরিত্রের লোক। ১৯৯৯ সালে চাঞ্চল্যকর ‘কুদ্দুস হত্যা’ মামলার আসামি ছিলেন শিবনাথ। সেসময় বোন হিসেবে তিনি ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে আপস-মীমাংসা করে তাকে ফাঁসির দড়ি থেকে রক্ষা করেছিলেন। অথচ আজ সেই ভাই-ই সম্পত্তির লোভে তাদের সাথে এ রকম আচরণ করছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে কেন্দুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী মাকসুদ গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের প্রেক্ষিতে গতকালকেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত চলছে। জায়গা-জমি নিয়ে ওই মহিলার স্বামীর সাথে তার ভাইয়ের দীর্ঘদিনের ঝামেলা রয়েছে এবং এলাকাবাসীও তাদের ওপর ক্ষিপ্ত। তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় এ মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।” পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন এবং ওসি জানান, উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে।
সব হারিয়ে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের হওয়া নুরুন্নাহার ও আব্দুল খালেক বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কখনো স্টেশন, কখনো রাস্তাঘাটে রাত কাটাচ্ছেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় বুক ভাসিয়ে নুরুন্নাহার বলেন, “আমার ৩৩ বছরের সাজানো সংসার, হাঁস-মুরগি, গরু-বাছুর, ছেলে-মেয়ের সার্টিফিকেট, জমির দলিল সব পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে। আমরা এখন পথের ফকির। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর সুষ্ঠু বিচার চাই এবং মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই।”