শেখ শামীম: মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার এবং নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেছেন, “সংসদ সদস্য হিসেবে গত দুই মাসের রাষ্ট্রযন্ত্রের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে, তাতে আগামীতে আমি আর নির্বাচন করব কিনা, তা নিয়ে আমার নিজের মাঝেই প্রশ্ন জেগেছে।”
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে পিছিয়ে পড়া বা অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে আয়োজিত ছাগল বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতেই কলমাকান্দার নাজিরপুর ইউনিয়নে একটি ব্রিজের পাশের রাস্তার কাজের উদাহরণ টেনে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “সরকার মানুষের জন্য টাকা দিয়েছে। কিন্তু এমন রাস্তা করা হয়েছে, হাত দিয়ে টানলেই রাস্তার ইট-কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে।” এ ঘটনার জন্য তিনি ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের গাফিলতিকে দায়ী করেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, “দুর্গাপুর-কলমাকান্দায় যাদের দুর্নীতির মানসিকতা আছে, দয়া করে আপনারা বিকল্প চিন্তা করেন। স্বেচ্ছায় অন্য জায়গায় বদলি হয়ে যান, আমি আপনাদের স্বাগত জানাব।”
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাজের প্রশংসা করলেও মাঠ প্রশাসনের চরম সমালোচনা করেন ডেপুটি স্পিকার। তিনি বলেন, “সচিব বা বড় ইঞ্জিনিয়ারদের ফোন দিলে তারা কাজ অনুমোদন করে দেন, কিন্তু মাঠ প্রশাসনে যারা তা বাস্তবায়ন করবেন, তাদের মধ্যেই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সাব-রেজিস্ট্রার, পিআইও, এলজিইডি, প্রাণিসম্পদ বা মৎস্য কর্মকর্তা- সবাই শুধু নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়াচ্ছেন, দেশের সম্পদ নয়। এমনকি হাসপাতালে ডাক্তার পোস্টিং থাকলেও তারা প্রেষণে অন্য জায়গায় টাকা কামাচ্ছেন।”
রাজনীতিবিদ ও সরকারি চাকরিজীবীদের মেয়াদের পার্থক্য তুলে ধরে কায়সার কামাল বলেন, “একটি রাজনৈতিক সরকারের আয়ুষ্কাল পাঁচ বছর। এরপর জনগণের কাছে পরীক্ষা দিতে হয়। কিন্তু প্রশাসনের লোকজন স্থায়ী। তাই একজন রাজনীতিকের চেয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা ও দেশের প্রতি ভালোবাসা বেশি থাকা উচিত।”
ডেপুটি স্পিকার আবেগময় কণ্ঠে বলেন, “এই দেশ আমাদের জন্ম দিয়েছে। হিন্দু বা মুসলমান যাই হই না কেন, আমাদের দাফন-কাফন বা দাহ দেশের মাটিতেই হবে। তাই দেশের প্রতি আমাদের ভালোবাসা থাকা জরুরি।”
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি কাউকে ‘অনগ্রসর’ বলতে চাই না। আমরা সবাই একসাথে অগ্রসর হতে চাই। গারো, হাজং, হিন্দু, মুসলিম- আমাদের সবার প্রথম পরিচয় আমরা মানুষ”। এ এলাকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন (ল্যাট্রিন) সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি তা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ৬৫ জন মানুষের মাঝে দুইটি করে ১৩০টি ছাগল বিতরণ করা হয়। কায়সার কামাল জানান, প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি তা আরও দুই বছর বাড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন। উপকারভোগীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ছাগলগুলো দয়া করে কেউ বিক্রি করবেন না বা খেয়ে ফেলবেন না। এগুলো পালন করে একটি থেকে পাঁচটি বানানোর চেষ্টা করবেন, যাতে আপনাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়।”
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে অনন্য নজির স্থাপন করেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি নিজে ছাগলগুলো বিতরণ না করে, গারো এবং হাজং সম্প্রদায়ের দুজন বয়োজ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিকে মঞ্চে ডেকে তাদের মাধ্যমে ছাগল হস্তান্তরের ঘোষণা দেন।
নিজেকে এলাকার ‘বাগানের মালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, “আমি নির্বাচনের আগে বলেছিলাম, আমি সুন্দর বাগানের মালি হতে চাই। আপনারা আমাকে সেই মালি হিসেবেই রাখুন।”

