নিজস্ব প্রতিবেদক: গভীর রাতে রাস্তা আটকে অপহরণ, এরপর নির্জন স্থানে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন ও জোরপূর্বক স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও ধারণ। শেষে নগদ অর্থ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লক্ষাধিক টাকা ছিনতাই। নেত্রকোনার শ্যামগঞ্জ এলাকায় এমন চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক ঘটনার শিকার হয়েছেন রতন মিয়া নামের এক বাঁশ ব্যবসায়ী।
এমন ভয়ঙ্কর ঘটনার মূল হোতা হিসেবে আবির আহম্মেদ রানা (ওরফে রানা মিয়া/রানা আকন্দ) নামের এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, রানা সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে সরকার নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী যুবলীগের একজন সদস্য এবং জামিনে বেরিয়ে এসে তিনি ফের পুরনো সন্ত্রাসী রূপে ফিরেছেন।
ভুক্তভোগী রতন মিয়া নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পাচগাঁও এলাকার বাসিন্দা। গত জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে ব্যবসার কাজে ট্রাকে করে বাঁশ নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। রাত আনুমানিক ৩টার দিকে শ্যামগঞ্জ এলাকায় পৌঁছালে রানার নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে ট্রাকটির গতিরোধ করে।
এরপর রতন মিয়াকে জোরপূর্বক ট্রাক থেকে নামিয়ে একটি মোটরসাইকেলে তুলে অজ্ঞাত নির্জন স্থানে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। সরিয়ে ফেলা হয় তার বাঁশবাহী ট্রাকটিও। ভোর ৪টা থেকে শুরু করে কয়েক ঘণ্টা তাকে আটকে রেখে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন করা হয়। চক্রটি তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের শেখানো কথা বলতে বাধ্য করে ভিডিও ধারণ করে রাখে। একপর্যায়ে সাথে নগত অর্থসহ রতন মিয়ার কান্না মোবাইল ফোনে তার পরিবারকে শুনিয়ে বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রায় এক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। পরবর্তীতে একটি স্যাটেলাইট টিভির নেত্রকোনা প্রতিনিধির কাছে এমন রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দেন ভুক্তভোগী। যার অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
কলমাকান্দা উপজেলার কৈলাটী ইউনিয়নের কান্দাপাড়া এলাকার হাবিবুর রহমানের ছেলে এই রানা মিয়া। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। জানা গেছে, তিনি ‘দৈনিক কালবেলা’র জেলা প্রতিনিধির পাশাপাশি সংবাদ ভিত্তিক স্যাটেলাইট টেলিভিশন ‘চ্যানেল ওয়ান’ এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘এশিয়া পোষ্ট’ এর নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন। এছাড়াও আত্মপ্রকাশের জন্য প্রক্রিয়াধীন ‘দৈনিক আগামীর সময়’ পত্রিকার নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে দাবি করেন রানা আকন্দ।
অপহরণ ও চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে রানার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি সদুত্তর দেননি। উল্টো নিজের অপকর্ম ঢাকতে তিনি প্রতিবেদকের বিরুদ্ধেই যুব উন্নয়নে কর্মরত মানিক সাহা এবং সাংবাদিক সাইফুল আরিফ জুয়েলের কাছ থেকে টাকা ও মোবাইল হাতিয়ে নেওয়ার মিথ্যা অভিযোগ তোলেন। পরবর্তীতে তাৎক্ষণিক ওই দুজনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা রানার অভিযোগকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দেন। এছাড়া, কৈলাটী ইউনিয়ন যুবলীগের কমিটিতে তার পদবির বিষয়ে প্রশ্ন করতেই রানা তড়িঘড়ি করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
রানার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ এটিই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট কলমাকান্দার গুমাই নদীর ফেরীঘাটে বালু ও পাথরবাহী নৌকার মালিকদের কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখমের ঘটনায় দায়ের করা মামলার ১৩ নম্বর আসামি এই রানা। ওই মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং বেশ কিছুদিন তিনি জেলও খাটেন।
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলমাকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শামীম বলেন, “আবির হোসেন রানা ২০২২ সালের কৈলাটি ইউনিয়ন যুবলীগ কমিটির ৫৫ নম্বর সদস্য। অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এরআগে ‘আজকের পত্রিকা’ তাকে বাদ দেয়। মিথ্যা পরিচয় এবং সীমান্তে চোরাকারবারী সংশ্লিষ্টতার কারণে এনএসআই তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল এবং পরে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পায়। এখন শুনছি সরকারি অফিসসহ বিভিন্ন স্থানে এই রানা কেন্দ্রীয় বিএনপি’র এক নেতার ‘ভাতিজা’ পরিচয় বহন করেন। অথচ ৫ আগস্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পূর্বে কৈলটি ইউনিয়ন আ.লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জয়নাল আবেদীন চেয়ারম্যানের ‘ভাগিনা’ পরিচয়ে নিজেকে জাহির করে বেড়াতেন রানা।”
বাঁশ ব্যবসায়ীর ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি (শামীম) আরও জানান, এই ঘটনায় পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও পরে স্থানীয়ভাবে টাকার বিনিময়ে বিষয়টি আপস-মীমাংসা করা হয়। গণমাধ্যমে এমন বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “কাউকে নিয়োগ দেওয়ার আগে তার অতীত কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিগত জীবন সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা উচিত, যাতে পুরো গণমাধ্যমের সুনাম ক্ষুন্ন না হয়।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জামিনে বেরিয়ে এসে রানা সাংবাদিকতাকে ঢাল বানিয়ে নিজের পুরনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেছেন। টাকার বিনিময়ে মীমাংসা করে এ ধরণের জঘন্য অপরাধ থেকে কেউ যাতে পার না পায় এবং ভুক্তভোগী রতন মিয়ার ঘটনাটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হয়- প্রশাসনের কাছে এমনটাই দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল।


