লোকমান আহমদ:
খেলা শেষ হতেই গ্যালারির প্রতিটি কোণে ছুঁয়ে যায় উচ্ছ্বাসের ঢেউ। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তখন শুধু জয় নয়- চলছে উৎসব। দর্শকরা সিলেটী জামাই ক্রিকেটার মঈন আলীকে ঘিরে গান ধরেন- “আইলারে নয়া দামান আসমানেরও তেরা”, “সুরমা গাঙ্গর ফারো বাড়ি আমরা হক্কল সিলটি”- গান, নাচ আর ‘সিলেট সিলেট’ স্লোগানে পুরো স্টেডিয়াম যেন রূপ নেয় এক আনন্দমিছিলে। এমন আবহেই শেষ হলো বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) দ্বাদশ আসরের সিলেট পর্ব, যেখানে শেষ ম্যাচে রংপুর রাইডার্সকে হারিয়ে জয় দিয়ে বিদায় নিল স্বাগতিক সিলেট টাইটান্স।
প্রবাদ বাক্যের মতোই- শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। শুরুতে ওঠানামা থাকলেও সিলেট পর্বের শেষ ম্যাচে দাপুটে জয়ে শুধু গুরুত্বপূর্ণ দুটি পয়েন্ট নয়, দর্শকদের মনও জয় করে নিয়েছে সিলেট টাইটান্স। সোমবার সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে রংপুর রাইডার্সকে ১৫ বল হাতে রেখে ৬ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারিয়ে বিপিএলের সিলেট পর্ব শেষ করে তারা।
টস জিতে প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু থেকেই রংপুরের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামায় সিলেটের বোলাররা। মাত্র ৬ রানেই সাজঘরে ফেরেন ওপেনার কাইল মেয়ার্স (০) ও তাওহীদ হৃদয় (৪)। কিছুটা আশা জাগিয়েও ইনিংস বড় করতে পারেননি লিটন দাস। চারটি চার হাঁকিয়ে ১২ বলে ২২ রান করে ফিরে যান তিনি। চতুর্থ উইকেটে পাকিস্তানি অলরাউন্ডার ইফতিখার আহমেদ ও খুশদিল শাহ ৪০ রানের জুটি গড়ে সাময়িক প্রতিরোধ গড়লেও বড় সংগ্রহ গড়ার পথে যেতে পারেননি। ইফতিখার ২০ বলে ১৭ এবং খুশদিল ২৪ বলে তিন চার ও এক ছক্কায় ৩০ রান করেন। এরপর নুরুল হাসান ব্যর্থ হলে (৯) আবারও ছন্দ হারায় রংপুর। শেষদিকে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ২৩ বলে চারটি চারে ২৯ রান করলেও দলকে লড়াই করার মতো পুঁজি এনে দিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ১৯.১ ওভারে ১১৪ রানেই অলআউট হয়ে যায় রংপুর রাইডার্স।
বল হাতে সিলেটের নায়ক ছিলেন স্পিনার নাসুম আহমেদ। নিজের চার ওভারে মাত্র ১৮ রান দিয়ে ৩ উইকেট শিকার করে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতেন সিলেটের এই সন্তান। সমান তিন উইকেট নেন পেস অলরাউন্ডার শহিদুল ইসলাম (৪ ওভারে ৩৬ রান)। ইংল্যান্ডের মঈন আলীও ছিলেন কার্যকর- ২ ওভারে মাত্র ৮ রান দিয়ে নেন ২টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। সম্মিলিত বোলিং নৈপুণ্যেই রংপুরকে অল্প রানে আটকে দেয় সিলেট।
১১৫ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই ম্যাচের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় সিলেট টাইটান্স। ওপেনিং জুটিতে তৌফিক খান ও পারভেজ হোসেন ইমন ৫৪ রান যোগ করে ম্যাচ একপ্রকার হাতের মুঠোয় নিয়ে নেন। তৌফিক খান ২২ বলে চারটি ছক্কা ও একটি চারে ৩৩ রান করে ফিরলেও দায়িত্বশীল ছিলেন ইমন। এরপর আরিফুল ইসলাম ২৬ বলে ২১ রান করে দলকে আরও এগিয়ে নেন। আফিফ হোসেন (১২) ও ইথান ব্রুকস (০) দ্রুত ফিরলেও কোনো চাপ তৈরি হয়নি। শেষ পর্যন্ত পারভেজ হোসেন ইমন ৪১ বলে তিনটি চার ও তিনটি ছক্কায় অপরাজিত ৫২ রান করে ছক্কা মেরে সিলেটের জয় নিশ্চিত করেন।
এই জয়ে সিলেট টাইটান্স ৯ ম্যাচে ৫ জয় ও ৪ হারে ১০ পয়েন্ট সংগ্রহ করে পয়েন্ট টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। গ্রুপ পর্বে সিলেটের এখনো একটি ম্যাচ বাকি। শীর্ষে থাকা চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স ও তিনে থাকা রাজশাহী ওয়ারিয়র্স- দুটি দলই ৭ ম্যাচে ১০ পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে। অন্যদিকে টানা তৃতীয় হারে ৮ ম্যাচে ৮ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে রংপুর রাইডার্স। প্লে-অফের পথে এখন বেশ শক্ত অবস্থানে সিলেট টাইটান্স।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গ্যালারি ভর্তি দর্শকের উন্মাদনার মধ্য দিয়েই শেষ হলো বিপিএলের সিলেট পর্ব। ১২ দিনে এখানে মোট ২৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, শুধুমাত্র সিলেট পর্বেই সর্বমোট প্রায় পৌনে ৩ কোটি টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছে, যা দর্শক আগ্রহ ও সফল আয়োজনের বড় প্রমাণ।
খেলা মানেই সিলেটবাসীর কাছে উৎসব। স্টেডিয়ামের প্রতিটি গেটে দীর্ঘ লাইন, ম্যাচ শুরুর ঘণ্টা কয়েক আগেই উপচে পড়া ভিড়, চার-ছক্কায় গ্যালারি কাঁপানো উল্লাস- সব মিলিয়ে প্রতিদিনই ছিল প্রাণবন্ত ক্রিকেট পরিবেশ। স্বাগতিক দলের ম্যাচের দিন দর্শকের ঢল সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।
নিরাপত্তার দিক থেকেও ছিল কড়া নজরদারি। সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে পুরো সিলেট পর্ব। যদিও টিকিট কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবু নিয়মিত অভিযান ও আটকের খবর মিলেছে। সবচেয়ে স্বস্তির বিষয়- এবার কোনো দর্শক মাঠে ঢুকে খেলা বন্ধ করেনি।
সব মিলিয়ে, বিপিএলের সিলেট পর্ব শেষ হলো জয়, উন্মাদনা আর সাফল্যের গল্প শুনিয়ে। নাসুমের ঘূর্ণি, ইমনের দৃঢ়তা আর সিলেটবাসীর ভালোবাসায়-এই পর্ব হয়ে থাকল স্মরণীয় হয়ে। শেষ ভালো যার- সব ভালো তারই।


