Site icon দ্যা মেইল বিডি / খবর সবসময়

ই-কমার্সে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত তরুণ উদ্যোক্তারা, ৬৬৭ কোটি টাকার মামলা

ই-কমার্স খাতে প্রতারণা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে নানা অভিযোগ উঠে আসছে গণমাধ্যমে। এতদিন ইভ্যালির নামে নানা অভিযোগের পরে এবার দৃষ্টিপটে হাজির হয়েছে ই-অরেঞ্জ ও ধামাকা শপিং নামে দু’টি প্রতিষ্ঠান। ই-অরেঞ্জের প্রতারণায় সর্বস্বান্ত হয়েছেন অনেক তরুণ উদ্যোক্তা।

বড় বড় অফারের ফাঁদে পড়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে এখন ধুঁকছেন তারা। তিন মাস আগে টাকা দিয়েও পণ্য না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছেন ভোক্তারা। এর মধ্যে আবার ই-অরেঞ্জের শীর্ষ কর্মকর্তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে কেউ কেউ বিদেশে পালিয়েও গেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত মে মাসে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পাঁচ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজধানীর শিল্পাঞ্চল থানায় ৬৬৩ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা হয়েছে।

মামলার অনুলিপিতে দেখা যায়, শুধু গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করেনি ই-কমার্স সাইট ই-অরেঞ্জ। কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে নানা বিরোধ। দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ এবং অবিশ্বাস। সূত্র জানায়, গত ১৫ মে থেকে পণ্য সরবরাহ বন্ধ রেখেছে ই-অরেঞ্জ। ওই দিনই দায়ের করা মামলায় কোম্পানির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা নাজমুল আলম রাসেলের বিরুদ্ধে ৬৬৩ কোটি ৩৩১ টাকা অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়।

 

মামলার এজাহারে কম্পানির মালিকপক্ষের হয়ে মোহাম্মদ আমান উল্লাহ চৌধুরী উল্লেখ করেন, নাজমুল আলম ই-অরেঞ্জ প্রতিষ্ঠান থেকে এই পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আর এই অর্থে তিনি গড়ে তোলেন ‘গো-বাই’ নামে আরেকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান।

সর্বস্বান্ত তরুণ উদোক্তারা:
ই-অরেঞ্জের সঙ্গে যারা ব্যবসা করছেন এমন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চলছে হা-হুতাশ। প্রায় ৮৬ হাজার সক্রিয় সদস্যের ফেসবুক গ্রুপে প্রতি মুহূর্তে তুলে ধরা হচ্ছে হতাশার কথা। তৌহিদ ইসলাম একজন বিনিয়োগকারী (আইডি ১৬১৪৫৭৫৪৬৬২৭৮) বলেন, ‘১ মার্চ থেকে আমাকে ফোন ডেলিভারি দিচ্ছে না। এটা নিয়ে প্রতিবাদ করে গ্রুপে (কর্তৃপক্ষ পরিচালিত ফেসবুক গ্রুপ) পোস্ট দিয়েছি, সেটাও অ্যাপ্রুভ করছে না। ই-অরেঞ্জ প্রথমে যেভাবে গ্রাহকদের গুরুত্ব দিত, এখন সেই জায়গা থেকে সরে গেছে। তারা ইভ্যালির মতো আচরণ করছে।’

তানভির রাসেল চৌধুরী নামের আরেক গ্রাহক বলেন, ‘ই-অরেঞ্জ পণ্য কিভাবে বুঝিয়ে দেবে? ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অফিস খরচের নামে এসব টাকা অপচয় করে শেষ করে ফেলেছে। শেষের দিকে যে টাকা হাতে ছিল সেই টাকা নিয়ে সোনিয়া মেহজাবিন (কম্পানি কর্তৃপক্ষের একজন) বিদেশে চলে গেছেন। শুধু শুধু একজনকে মালিকানা ট্রান্সফার করে দিয়ে গেছেন।’

আরেক বিনিয়োগকারী এ কে এম পলাশ বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর আগে তাঁর দেওয়া অর্থ আমি ই-অরেঞ্জে বিনিয়োগ করি। শুরুতে তাদের নানা কৌশলের কাছে হার মানি। ভালোই চলছিল। হঠাৎ তাদের ডেলিভারি বন্ধ হয়েছে। তিন মাস পেরিয়ে গেল অর্ডারকৃত পণ্য পাচ্ছি না। শুনছি, তাদের অফিসও অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগকৃত ২০ লক্ষাধিক টাকা পাব কি না জানি না। চিন্তায় ঘুমাতে পারছি না। পরিবারকেও কিছু বলতে পারছি না। এমন হলে আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকবে না।’

আইনের আওতায় আনা উচিত:
এখনই পরিস্থিতির লাগাম টেনে না ধরতে পারলে তরুণ উদ্যোক্তারা বিনিয়োগবিমুখ হবেন বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তিনি মনে করেন, অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় সরকারের পক্ষ থেকে যে নীতিমালা করা হয়েছে শক্তভাবে তার প্রয়োগ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শুরু থেকেই অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার বিষয়ে নীতিমালা না থাকার কারণেই এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। এখন যে নীতিমালা হয়েছে তা বাস্তবায়নে যথাযথ মনিটরিং দরকার। আর সম্প্রতি যেসব অনলাইনভিত্তিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদের ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

প্রতিবছর বেকারের তালিকায় যোগ হচ্ছিল ২৬ লাখ তরুণ। সেই তরুণরা যখন উদ্যোক্তা হতে শুরু করেছে, তখন অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায়প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতি তাদের হতাশ করে দিচ্ছে বা পথে বসাচ্ছে। এদিকে ভোক্তা এবং বিক্রেতাকে ঠকিয়ে রাতারাতি হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছেন এসব অনলাইনভিত্তিক কম্পানির মালিকরা। অথচ দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের যুবক ও উদ্যোক্তারা অনলাইনে এসব মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিজেরা পুঁজি খাটাচ্ছে না। তারা সস্তায় প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিয়ে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে স্বনামধন্য ব্যক্তিদের সামনে রাখা হচ্ছে, আড়ালে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে সুবিধা নিচ্ছে রাঘব বোয়ালরা।

সূত্র: কালের কণ্ঠ পত্রিকা

Exit mobile version