মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | The Mail BD

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে কঠোর বার্তা দিয়েছেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। তিনি বলেছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকার এবং বৃহত্তর যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রচেষ্টা—দুটিই একসঙ্গে চালিয়ে যেতে চায় কাতার। একই সঙ্গে সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) কাতারের রাজধানী দোহায় দেশটির শূরা কাউন্সিলের ৫৫তম বার্ষিক অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন আমির। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কাতার ও মধ্যপ্রাচ্যকে যে অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা তুলে ধরে তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, জাতীয় সংহতি এবং নিরাপত্তা রক্ষার প্রস্তুতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ইরানের বিরুদ্ধে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ

ভাষণে শেখ তামিম বলেন, ইরান কাতারের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে, যা দেশটির সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইনের বিধান এবং প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি বলেন, কাতারের সশস্ত্র বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দেশের প্রতিরক্ষায় নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছে। দেশের প্রতিরক্ষায় প্রাণ উৎসর্গকারীদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি। আমিরের বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংকট মোকাবিলায় কাতারের প্রস্তুতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর মতে, সংকটের সময় দৃঢ়ভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা হঠাৎ তৈরি হয় না; এর পেছনে থাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা।

তবে আত্মরক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সংঘাত যাতে আরও বিস্তৃত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার কথা বলেন তিনি।

‘আলোচনায় আগ্রহ মানে আত্মরক্ষায় দুর্বলতা নয়’

কাতারের আমির বলেন, সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি দেশটির অঙ্গীকারকে নিজেদের প্রতিরক্ষা নিয়ে আপস করার মানসিকতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। একইভাবে সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকার থাকলেও বৃহত্তর যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা সম্ভব। তিনি বলেন, মতবিরোধ নিরসনে কাতার বরাবরই সংলাপ, আলোচনা ও কূটনৈতিক পথকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতেও দেশটি সেই অবস্থান বজায় রাখবে।

শেখ তামিমের বক্তব্যে কাতারের কূটনৈতিক অবস্থানের দুটি দিক স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে, দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান; অন্যদিকে, আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা।

তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে পড়ছে।

হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচলের আহ্বান

ভাষণে উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন কাতারের আমির। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পানিসম্পদ স্থাপনা এবং বেসামরিক অবকাঠামোর সুরক্ষায় আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই পথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। যুদ্ধের কারণে এ অঞ্চলের নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শেখ তামিম বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্যদেশগুলোর নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। এ জন্য সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

তাঁর মতে, বিশ্বের এক অঞ্চলের অস্থিতিশীলতাকে অন্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। আঞ্চলিক নিরাপত্তার অবনতি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে কাতারের অর্থনীতিতেও

কাতারের আমিরের ভাষণে আঞ্চলিক সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবও উঠে আসে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে কাতারের জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌপথের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শেখ তামিম জানান, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং রাস লাফান শিল্পনগরীর কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির কারণে কাতারের রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এতে দেশটির অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, সংকটের মধ্যে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা, সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। জরুরি পণ্য ও কৌশলগত মজুত নিশ্চিত করতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতও কাজ করেছে। আমিরের ভাষ্য অনুযায়ী, সংকটের প্রভাব মূলত জ্বালানি খাতে বেশি পড়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানিবহির্ভূত খাতগুলোতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার চেষ্টা করেছে দেশটি।

তিনি আরও জানান, সংকট মোকাবিলায় কাতারের কৌশলের মধ্যে রয়েছে দেশের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় সেবা ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা, যুদ্ধবিরতি এবং নৌপথ পুনরায় চালুর প্রচেষ্টায় অংশ নেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আলোচনার পথ খোলা রাখা।

ফিলিস্তিন ইস্যুতেও অবস্থান পুনর্ব্যক্ত

ভাষণে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতি কাতারের সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেন শেখ তামিম। গাজায় সংঘটিত ঘটনাবলিকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে এর জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি। এ ছাড়া অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা, আল-আকসা মসজিদে বারবার অভিযান এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন কাতারের আমির। সুদান, লিবিয়া, ইয়েমেন ও সোমালিয়ার সংকটের সমাধানেও ব্যাপকভিত্তিক ও ন্যায্য রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

সব মিলিয়ে, শূরা কাউন্সিলের অধিবেশনে শেখ তামিমের বক্তব্যে কাতারের তিনটি অগ্রাধিকার সামনে এসেছে—দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো।

Share.

মোঃ আব্দুল আওয়াল হিমেল
প্রকাশক ও সম্পাদক 
দ্যা মেইল বিডি ডট কম
মোবাইল: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
ইমেইল: themailbdnews@gmail.com
ঠিকানা: ১০২/ক, রোড নং-০৪, পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭

নিউজরুম: +৮৮০ ১৩১৪-৫২৪৭৪৯
জরুরী প্রয়োজন অথবা টেকনিক্যাল সমস্যা: +৮৮০ ১৮৩৩-৩৭৫১৩৩

© ২০২৬ The Mail Bd.. Designed and developed by Saizul Amin.
Exit mobile version