শেখ শামীম: গত ২৬ এপ্রিলের কালবৈশাখী ঝড়ে মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার অসহায় এক বৃদ্ধা। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিওর কল্যাণে তার জীবনে আবারও আশার আলো ফিরেছে। ওই বৃদ্ধার দুরবস্থার কথা জানতে পেরে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি দ্রুত ওই বৃদ্ধার জন্য নতুন ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন।
নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার বড়খাপন ইউনিয়নের বড়খাপন গ্রামের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম। ৫৯ বছর বয়সী বৃদ্ধার জীবনের গল্প অত্যন্ত করুণ। বহু বছর আগে তিনি তার স্বামীকে হারিয়েছেন। তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিল তার একমাত্র সন্তান। দুর্ভাগ্যবশত বিগত পাঁচ বছর আগে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় সেই সন্তানটিও মারা যায়।
গত ২৬ এপ্রিল বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড় তার জীবনের শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও কেড়ে নেয়। ঝড়ে তার একমাত্র টিনের ঘরটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে মাটির সাথে মিশে যায়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ঘরের চালের টিন এবং অন্যান্য কাঠামোগুলো মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে ও বসে থাকতে দেখা যায় নিঃস্ব মনোয়ারা বেগমকে।
ঝড়ে ঘর হারানোর পর সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়ে পড়েন এই বৃদ্ধা। অন্যের বাড়িতে কাজ করে এবং চেয়েচিন্তে তার দিন কাটছিল। নিজের বলতে ওই জায়গাটুকু ছাড়া তার আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ এপ্রিল, মঙ্গলবার কলমাকান্দার স্থানীয় সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আব্দুর রশিদ মনোয়ারা বেগমের বিধ্বস্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটি ভিডিও ধারণ করেন।
ভিডিওটিতে আব্দুর রশিদ সমাজের বিত্তবানদের কাছে অসহায় এই বৃদ্ধার জন্য একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়ার আবেদন জানান। একই ভিডিওতে অশ্রুসিক্ত নয়নে মনোয়ারা বেগম বলেন, তার কেউ নেই এবং তিনি মানুষের কাছে হাত পেতে ও অন্যের বাড়িতে কাজ করে বেঁচে আছেন। তিনি ঘর নির্মাণের জন্য সবার কাছে আকুতি জানান। আব্দুর রশিদ তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এই ভিডিও ও ঘটনাটি তুলে ধরেন, যা দ্রুত নেটিজেনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আব্দুর রশিদের পোস্টটি ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবারই ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এমপি মহোদয়ের নজরে আসে। বিষয়টি জানার পরপরই তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি সরাসরি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আব্দুর রশিদের সাথে যোগাযোগ করে মনোয়ারা বেগমের সার্বিক খোঁজখবর নেন। এরপর তিনি অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে মনোয়ারা বেগমকে নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে আব্দুর রশিদ গণমাধ্যমকে মানবিক এই উদ্যোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ডেপুটি স্পিকার মহোদয়ের নির্দেশে ইতোমধ্যে ঘর নির্মাণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা সম্পন্ন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামীকাল, বৃহস্পতিবার থেকেই নতুন ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
ভাবতেই পারেননি কেউ তার এই ভাঙা ঘরের খবর নেবে, এমনটাই জানিয়েছেন আবেগাপ্লুত মনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, “আমি সব হারিয়ে একদম নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলাম। কেউ আমার কথা শুনবে ভাবিনি। ডেপুটি স্পিকার আমার জন্য ঘর করে দেওয়ার কথা বলেছেন। আল্লাহ যেন তাকে ভালো রাখেন, আমার জন্য এটা অনেক বড় সহায়তা।”
এলাকাবাসীও এমন দ্রুত পদক্ষেপে অত্যন্ত আনন্দিত। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এটি কেবল আর্থিক বা কাঠামোগত সহায়তা নয়, এটি একজন সব হারানো মানুষের জীবনে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন ফিরিয়ে দেওয়ার মতো একটি অনন্য মানবিক উদ্যোগ। ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এমপি মহোদয়ের সহানুভূতিশীল পদক্ষেপে স্থানীয় এলাকাবাসী তার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

