শেখ শামীম, কলমাকান্দা: নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় আধুনিক শিল্পকলা একাডেমি নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের উপ-স্পিকার (ডেপুটি স্পিকার) ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। একইসঙ্গে তিনি কোনো অনুষ্ঠানে তাকে দামি ফুলের তোড়া বা তোরণ দিয়ে স্বাগত জানানোর মতো অপচয় রোধ করে সেই অর্থ জনকল্যাণে বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ব্যয় করার আহ্বান জানিয়েছেন।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কলমাকান্দা উপজেলা পরিষদ হলরুমে ‘জনতা কালচারাল একাডেমি’র বার্ষিক পরীক্ষার সনদ ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জনতা কালচারাল একাডেমির নির্বাহী পরিচালক আফরোজা বেগম শিমুর সভাপতিত্বে এবং শিক্ষক এনামুল হক তালুকদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসান, কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিদ্দিক হোসেন, উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এম এ খায়ের, প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ শামীম ও সাধারণ সম্পাদক ওবাইদুল হক পাঠানসহ একাডেমির শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ‘জনতা কালচারাল একাডেমি’র সমৃদ্ধ কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন। নিজ এলাকার এমন একটি উন্নত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কথা আগে না জানায় তিনি বিনয়ের সঙ্গে দুঃখপ্রকাশ করেন। দুর্গাপুরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ঢাকা বা ময়মনসিংহের আদলে কলমাকান্দায়ও শিল্পকলা একাডেমি গড়ে তোলা হবে এবং সেখানে জনতা কালচারাল একাডেমিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।”
অনুষ্ঠানে তাকে দেওয়া ফুলের তোড়ার প্রসঙ্গ টেনে ডেপুটি স্পিকার বলেন, “একটি ফুলের তোড়া বানাতে দুই-তিন হাজার টাকা খরচ হয়। আমি কৃষকের সন্তান, গরিব ঘরের সন্তান ছিলাম। আমি এ ধরনের অপচয় চাই না। এই টাকা দিয়ে একাডেমির জন্য একটি তবলা বা বাদ্যযন্ত্র কেনা যেত, কিংবা কোনো দুস্থ মানুষকে সাহায্য করা যেত।” এখন থেকে কোনো অনুষ্ঠানে ফুলের তোড়া বা তোরণ নির্মাণে অর্থ ব্যয় না করার জন্য তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও আয়োজকদের প্রতি নির্দেশনা দেন। তবে একাডেমির শিশুদের দেওয়া হাতের তৈরি সাধারণ শুভেচ্ছা কার্ড বা ফুলকেই তিনি তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে উল্লেখ করেন।
তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার ওপর জোর দেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত মায়েদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি নিজের জীবনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ছোটবেলায় আমার মা রাতে ঘুমানোর আগে আমাকে কবিতা শোনাতেন। মায়েরা যদি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই দেশীয় সংস্কৃতি, ছড়া ও কবিতার সাথে পরিচয় করান, তবে সেই সন্তানরা বড় হয়ে বিপথগামী হবে না। শিশু সুমানুষ হলে তার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র উপকৃত হয়।” তিনি ভিনদেশি অপসংস্কৃতি পরিহার করে দেশীয় সংস্কৃতিকে লালন করার তাগিদ দেন।
জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপট টেনে উপ-স্পিকার বলেন, “মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে বাংলাদেশ পেয়েছিলাম, তার উদ্দেশ্য শুধু একটি পতাকা বা পাসপোর্ট পাওয়া ছিল না। আমাদের পূর্বসূরিরা অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক মুক্তির জন্য দেশ স্বাধীন করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা তা থেকে পিছিয়ে ছিলাম। মহান জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে আবারও সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ গ্রহণ করার।”
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আরও বলেন, “আমার কাছে কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে খ্রিষ্টান বা কে হাজং- সেটি বিবেচ্য বিষয় নয়। কে কোন দল বা মতের, সেটাও মুখ্য নয়। আমার কাছে বিবেচ্য হলো একজন মানুষের মেধা ও মনন। মেধা ও মননের ভিত্তিতেই সবাইকে মূল্যায়ন করা হবে।” সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অবহেলিত কলমাকান্দাকে ‘মডেল কলমাকান্দা’ হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
এরআগে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে জনতা কালচারাল একাডেমির ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা বর্ণিল সাজে ও প্ল্যাকার্ড হাতে ডেপুটি স্পিকারকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে শিশুদের সাথে কুশল বিনিময় করেন। অনুষ্ঠানে একাডেমির শিক্ষার্থীরা মনোজ্ঞ দলীয় সঙ্গীত ও জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে।
এছাড়া রাষ্ট্রপতি পদকপ্রাপ্ত একাডেমির শিক্ষার্থী আলিফের বিশেষ প্রশংসা করেন প্রধান অতিথি এবং তার কণ্ঠে গান শোনার আগ্রহ প্রকাশ ও গান শুনেন। পরে কালচারাল একাডেমির পক্ষ থেকে প্রদেয় পাঞ্জাবি আলিফকে উপহার প্রদান করেন।
