বিগত সরকারের আমলে (২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল) বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আর পাচার হওয়া এসব অর্থ পুনরুদ্ধারে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে-বিদেশে এ পর্যন্ত সর্বমোট প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ (ফ্রিজিং) করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণের আস্থার সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে তাদের কাছে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, অতীতে অনেক রাজনৈতিক দল বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কেউ কেউ তো টিকিটও বিলি করেছিল। তবে গত নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেটের মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষ বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’সহ অন্যান্য কল্যাণমুখী পরিকল্পনার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার জনগণের এই আস্থার পূর্ণ মর্যাদা দেবে। তাদের কাছে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে পালন করার ব্যাপারে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। গতকাল জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ষষ্ঠ দিনে সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। গতকাল প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এমপিদের প্রশ্নের জবাব দেন তারেক রহমান। এ সময় তাঁর পাশে থাকা তিন মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমদ প্রশংসা করেন। এ সময় ভিআইপি গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমান। প্রশ্নের উত্তর শেষে প্রধানমন্ত্রী মেয়ের সঙ্গে ইশারায় তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চান। মেয়ে জাইমা সঙ্গে সঙ্গে প্রশংসাসূচক ইশারায় তাঁরা প্রতিক্রিয়া জানান। সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী বুধবার প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকে।
সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; যা বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা)। পাচার করা এ অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশ– যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকং-চীনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দেশ মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ সইয়ের বিষয়ে সম্মতি মিলেছে। অপর সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি আন্তসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্সের চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া চলমান। মামলাগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে এবং পুলিশের সিআইডি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল ও শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করা হয়। সম্পদ জব্দের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, আদালত দেশে মোট ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। অপরদিকে, আদালতের নির্দেশে বিদেশে মোট ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়। সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে সর্বমোট প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার সম্পদ সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
মামলার হালনাগাদ তথ্য জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ছয়টি মামলার রায় দেওয়া হয়। বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তারেক রহমান আরও উল্লেখ করেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
আগামী চার বছরে ৪ কোটি পরিবার পাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড : মূল্যস্ফীতি হবে না : পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী চার বছরের মধ্যে দেশব্যাপী ৪ কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, এ কর্মসূচির মূল দর্শন হচ্ছে- ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। নারীদের কেন এই কার্ড দেওয়া হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে প্রচলিত ৯৫টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া হয়। এতে পরিবারে সিদ্ধান্ত প্রদান ও মর্যাদা বৃদ্ধি তথা পরিবার ও সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে। আকতার হোসেনের এক সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এর কারণে দেশে কোনো ধরনের মূল্যস্ফীতি হবে না। আমরা তো টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছি না। আমরা যেহেতু টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছি না কাজেই মূল্যস্ফীতি হবে না। বরং আমরা মনে করি এই টাকাগুলো যখন মার্কেটে যাবে যারা কৃষক কার্ড পাচ্ছেন সেই সব কৃষক যারা প্রান্তিক পর্যায়ে নারীরা যারা পাচ্ছেন টাকা নিশ্চয়ই তারা সিঙ্গাপুর বা বিভিন্ন দেশে টাকা পাচার করবেন না। ফলে লোকাল ইকোনমি আস্তে আস্তে মজবুত হবে, লোকাল ইকোনমি আস্তে আস্তে বড় হবে। তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে বাজেট কত এটি আমরা আপনাদেরকে এখনই বলছি না অর্থাৎ আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে জিনিসগুলোকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাব। পৃথিবীর কোনো দেশের পক্ষে একবারে সেটি করা সম্ভব না। সেজন্য প্রতি বছরই আমরা বাজেটের স্যাংশন বাড়াব, প্রতি বাজেটে আমরা টাকা বরাদ্দ করব। এভাবে পর্যায়ক্রমিকভাবে ধীরে ধীরে আমরা এগোব।
