শাহ আলী তৌফিক, কেন্দুয়া: নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার গড়াডোবা ইউনিয়নে কইজুরি খাল ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথটি বন্ধ থাকায় কইজুরি বিল ও সংলগ্ন পাঁচটি গ্রামের হাজারো কৃষকের জীবিকা এখন মারাত্মক হুমকির মুখে। দীর্ঘদিনের স্থায়ী জলাবদ্ধতায় বিলের প্রায় একশো একর জমির একটি বড় অংশ বছরের পর বছর ধরে অনাবাদি পড়ে আছে। যেটুকু জমিতে আবাদ হচ্ছে, সেখানেও দেখা দিয়েছে ফসলহানির চরম শঙ্কা।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সরেজমিনে এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জনদুর্ভোগের করুণ চিত্র উঠে এসেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বিলসংলগ্ন শাখরা, চিকনি, কালেঙ্গা, পুবাইল ও বিদ্যাবল্লভ- এই পাঁচটি গ্রামের কয়েক সহস্রাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার। কইজুরি বিলের প্রায় একশো একর জমির মধ্যে অন্তত ৪০-৫০ একর জমি দীর্ঘ দুই দশক ধরে সম্পূর্ণ অনাবাদি পড়ে আছে। বাকি জমিগুলোতে কৃষকরা বোরো আবাদের চেষ্টা করলেও, মৌসুমের আগেই জলাবদ্ধতার কারণে ফসল তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। ফলে প্রতিবছর হাজার হাজার মণ ধানের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা।
কৃষিকাজ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক পেশা পরিবর্তন করছেন। কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে মাছ চাষ শুরু করলেও স্থায়ী জলাবদ্ধতায় সেখানেও তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক সবুজ মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “আমার ১০ কাঠা জমি ২০ বছর ধরে অনাবাদি। জমিতে ফসল না হওয়ায় সংসার চালাতে এখন বাধ্য হয়ে দিনমজুরি করতে হচ্ছে।” আরেক কৃষক আনু মিয়া স্মৃতিচারণ করে বলেন, “একসময় এই বিলে হাজার হাজার মণ ধান হতো। এখন খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পুরো বিলটাই প্রায় সারাবছর পানির নিচে থাকে।”
জানা যায়, প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ কইজুরি খালটি দিয়ে একসময় ছোট ছোট নৌযান চলাচল করত এবং বিলের পানি সরাসরি পাটেশ্বরী নদীতে গিয়ে মিশত। স্থানীয় প্রবীণদের দাবি, ১৯৭৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির আওতায় এই খালটি খনন করা হয়েছিল।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় দখলদারিত্ব এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে খালটির অস্তিত্ব আজ বিলীনের পথে। খালের মুখে বাঁধ ও দখলের কারণে পানি প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ। ফলে উজান থেকে নেমে আসা পানি বিলের মধ্যে আটকে থাকছে। কচুরিপানা ও পলি জমে এখন পরিণত হয়েছে কাদাপানির জলাশয়ে। যা মাছসহ জলজ প্রাণীর অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।
সমস্যা সমাধানে স্থানীয় কৃষকরা বসে নেই। তারা নিজেদের উদ্যোগে চাঁদা তুলে ও শ্রম দিয়ে প্রায় আটশো মিটার থেকে এক কিলোমিটার পর্যন্ত খাল খনন করেছেন। কিন্তু খালের বাকি অংশ প্রভাবশালী দখলদারদের কবলে থাকায় এবং দখলমুক্ত করতে না পারায় বর্তমানে খনন কাজ থমকে আছে।
কৃষক সম্রাজ মিয়ার কণ্ঠে যেন পুরো এলাকার দাবিই প্রতিধ্বনিত হয়, “আমাদের একটাই দাবি, খালটি খনন করে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা হোক।”
খালটি খননের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমি রেকর্ডের জটিলতা। এ বিষয়ে ইউপি সদস্য স্বপন তালুকদার বলেন, “খালটি ভূমি জরিপ নকশায় না থাকায় সরকারিভাবে উদ্যোগ নিতে কিছুটা আইনি জটিলতা হচ্ছে। তবে এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি অনুযায়ী খালটি পুনর্বহালের চেষ্টা চলছে।”
বৃহস্পতিবার (১ এপ্রিল) এ বিষয়ে কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, “১৯৮৩ সালের ভূমি জরিপ রেকর্ডে খালটির অস্তিত্ব নেই বলে জানা যাচ্ছে। তবে আমরা সিএস (CS) ও আরওআর (RoR) রেকর্ড নিবিড়ভাবে যাচাই করছি। জনস্বার্থে খালটি পুনরায় রেকর্ডভুক্ত করা এবং দখলমুক্ত করে পুনঃখননের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অন্যদিকে, নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন আশার আলো দেখিয়ে বলেন, “জেলার যেসব খাল-নদী দখল হয়ে গেছে বা ভরাট হয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পুনঃখননের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। কইজুরি খালের বিষয়েও প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন।”
প্রশাসনের আশ্বাস থাকলেও, বাস্তবায়নের ধীরগতিতে হতাশ এলাকাবাসী। তাদের জোর দাবি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কইজুরি খাল দখলমুক্ত ও পুনঃখনন করা হোক। তা না হলে এলাকার কৃষি ও মৎস্য খাতের অপূরণীয় ক্ষতি আরও বাড়বে এবং স্থায়ীভাবে জীবিকা হারাবে আরও হাজারো পরিবার।
